গল্প: ময়নার বাক্স

Share Button

সাতক্ষীরা নিউজ ডেস্ক ::
১. ময়না আর ময়নার বাক্স নিয়ে বড়ই বিপদে। পরিবারের সদস্যদের সাথে তাকে নিয়ে তুলকালাম কান্ড। তার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক। আজও তাকে কেনো ভুলা যায়নি। ময়নার বাক্সে এমন কি আছে যে তার কাছে গেলে চোখে পানি আসে। ময়না ও ময়নার বাক্স নিয়ে এভাবে নানান প্রশ্ন নানান জনের। আমার সাথে ময়নার যে সম্পর্ক তা ভুলবার নয়। তার গভীর ভালোবাসা কখন ভুলবার বা অস্বীকার করার মত নয়। আমার জীবনে শ্রেষ্ট উপহার ময়না। মুহূর্তের জন্য আজও তাকে ভুলতি পারিনি। ভুলা সম্ভবও নয়। ওর সংস্পর্শে অন্য রকম সুখ অনুভব করতাম। অনেক আগে তাকে হারিয়েছি। তার রেখে যাওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে এখন তাকে খুঁজি ফিরি। সেগুলি এখন স্মৃতি। সেই স্মৃতিময় জিনিসপত্র যত্ন করে একটি বাক্স্রের মধ্যে রেখে দিয়েছি। লাল সবুজের কাপড় দিয়ে বাক্সটি মুড়িয়ে কাপড়ের উপর লিখে রেখেছি “ময়নার বাক্স”।

বাসর রাতে ঝর্ণাকে ময়নার কথা বলতে চেয়েছি। বলতে পারিনি। যার কারণে ময়না ও মাকে হারিয়েছি – সে সম্পর্কে ওর চাচা। তার সাথে ওদের দা – কুমড়ো সম্পর্ক। আমার বাড়ী থেকে এক গ্রাম পর ঝর্ণাদের বাড়ী। ময়নার সাথে আমার গভীর সম্পর্কের কথা ঝর্ণাকে বলেও বলা হয়নি। ভীষণ অভিমানী ও প্রতিবাদী ঝর্ণা। ময়নার মতো ওকে হারাবার ভয়ে ময়নার কথাগুলো বলা হয়নি। ওর চাচা শহীদুল রাজাকার এতো বর্বর, এতো খারাপ যে পশুর আচারণ তার কাছে হার মানে। এহেন কাজ নেই যা তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তার আচারণের কথা ভেবে ময়নার কথা ওকে বলা হয়নি। ভেবেছি সময় হলে সব জানাবো। ময়নার নিয়ে ঝর্ণার সাথে বেশ গন্ডগোল হয়েছে। এখন তাকে নিয়ে আর কিছু বলেনা। ময়নাকে নিয়ে মনে মনে যে তার কষ্ট আছে তা বুজতে পারি।

এর ভিতর অনেক সময় পার হয়ে যায়। আমাদের ঘর জুড়ে আসে শাদমান ও শাফায়াত। শাদমানের বয়স ২৩ আর সাফায়াত ১০ । আমি ওদের বন্ধু আর মা পরম বন্ধু। সব মিলিয়ে আমাদের সোনার সংসার। আমার প্রতি ওদের প্রাণঢালা ভালোবাসা। ৭ ডিসেম্বর আমার জীবনে বড় কষ্টের দিন। বেদনার দিন । স্বজন হারানোর দিন। এ দিনটি আসলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনা। ময়নাকে আর মাকে এই দিনেই হারায়। সে দূশ্য দেখার নয়। কি যে কষ্ট, কি যে বেদনার তা বলার নয়। পৃথিবীর সব সুখ শান্তি,বউ সন্তানের আদর ভালোবাসা সবকিছুই ঐদিন কেমন জানি লাগে। কিছুই ভালো লাগে না। কষ্টে ময়নার বাক্সটা বুকে জড়িয়ে তাকে খুঁজতে থাকি। তার ভালোবাসাকে খুঁজতে থাকি। তার জন্য মন হা হা কার করে।


পরদিন অফিস থেকে এসে খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে যায়। পাশের রুমে ছেলেরা মার সাথে কি যেন আলাপ করছে। কিছুটা বুঝতে পারলাম ময়না আর ময়নার বাক্স নিয়ে। গতকাল ৭ ডিসেম্বর ছিল। ময়না আর মার কথা মনে আসলো। ২য়তলায় গিয়ে ময়নার বাক্সটা পরিস্কার করতে করতে চোখে পানি এসে গেলো। ছোট ছেলে তা দেখে দৌড়ে নীচে গিয়ে বড় ভাইকে খবর দেয়। দুভাই এসে দেখে আমি চোখ মুচছি। আমাকে কিছু না বলে সোজা নীচে মায়ের কাছে যায়। মার কাছে গিয়ে বড় ছেলে জিঞ্জাসা করে, মা- বাবাকে দেখলাম উপরের ঘরে লাল সবুজে কাপড়ে মোড়ানো একটি বাক্স বুকে জড়িয়ে কাঁদতে। কাপড়ের উপর লেখা ময়নার বাক্স। ময়না কে মা ? বাক্সের ভিতর কি আছে ? ছেলের কথা শুনার সাথে সাথে মা ছেলেকে বললো, চুপ চুপ। তোর বাবা এখনও ঘুমায়নি। ঐ বাক্সের কথা জিঞ্জসা করিস না। তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে বসবে। বাক্স নিয়ে তোর বাবার সাথে অনেক কথা হযেছে। বলতে বলতে তার চোখে পানি। পরক্ষণে আবার জিঞ্জাসা করলো মা – বাবার কি তবে অন্য মেয়ের সাথে—মা বললো খবরদার, একথা তোর বাবা শুনলে আর রেহাই নেই। রাত হয়েছে ঘুমা।

আমি তখনও ঘুমায়নি। মা -ছেলের কথা শুনে রাগ হলেও ভাবলাম না, আর না । ছেলেরা বড় হয়েছে। এবার তাদের সামনে সব ঘটনা খুলে বলা উচিত। ঠিক করলাম আগামীকাল ছুটির দিন। সেদিন সবাইকে ডেকে ময়নার কথা, ময়নার বাক্সের কথা বলবো। সকালে অফিসে গেলাম। বাসায় এসে দেখি এলাহিকান্ড। শ্বশুরবাড়ীর আত্মীয় সজন বাসায় হাজির। বড় ছেলের সামনে একটি টেবিল। তার উপরে রাখা ময়নার বাক্স। বাক্সের গায়ের উপর লাল সবুজের কাপড়টা নেই। খালি বাক্সের গায়ে সাদা কালি দিয়ে লেখা – লাল লিপিস্টিক, লাল বেনারসি শাড়ী, লাল দু‘ডজন কাচের চুড়ি, লাল ফিতা, আলতা। বাসায় ঢুকতেই বড় ছেলে বললো, বাবা – এদিকে আস। বাক্সটা দেখিয়ে নানা নানীর সামনে কঠিনভাবে জিঞ্জাসা করলো। এই বাক্সের ভিতর রাখা শাড়ী চুড়ি কাকে দিবে বলে রেখেছো ? ময়না কে? তার সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক ? আজও তাকে ভুলতে পারনি কেনো ? তার জন্য এখনও চোখের পানি ফেলো। তাকে যদি ভালোই বাস তবে মাকে বিয়ে করলে কেনো ? আজ তোমাকে সব বলতে হবে। তোমার দেয়া কষ্ট মা সইতে সইতে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। বলতে হবে এই ময়না কে ? সে এখন কোথায় ? ৭ ডিসে¤রে আসলে কি ঘটেছিলো ? ময়নার সাথে তোমার গভীর ভালোবাসার কথা মাকে বলতে চাওনা কেনো ? আজ বলতে হবে ? ছেলের সাথে সাথে উপস্থিত সবাই বলে উঠলো, হ্যা আজ তোমাকে সব বলতে হবে ?

ভাবলাম, ময়নার কথা এখন বলা যায়। যে পরিস্থিতি যদি না বলি অন্য রকম ঘটনা ঘটতে পারে। হাতের ব্যাগটি রেখে জামা কাপড় না খুলে সোজা উপরের ঘরে গেলাম, বাক্সের চাবিটি আনতে। চাবি এনে সবাইকে বললাম, আজ বলবো ময়না কে ? ময়নার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক ? তাকে আজও কেনো ভুলতে পারিনি ? ওর জন্য কেনো এখনও চোখের পানি ফেলি ? সব বলবো।


চাবিটা বড় ছেলের হাতে দিয়ে বললাম, বাক্স খোলো। চাবি দিয়ে বাক্স খুললো। একে একে বাক্স থেকে শাড়ী, চুড়ি, আলতা, লিপিস্টিক ফিতা বের করলো। এসব দেখে তো হতবাক। বড় ছেলে বলে উঠলো এ তো সব একটা বাচ্চা মেয়ের জিনিস। মার দিক তাকিয়ে বললো মা এতো বাচ্চাদের জিনিস। ঝর্ণাসহ উপস্থিত সবাই হতবাক। জিনিসগুলো দেখে চোখে পানি আসে । চোখের পানি দেখে বড় ছেলে কাছে এসে জড়িয়ে ধরলো। ওপাশ থেকে ঝর্ণা কাছে এসে বসলো। ছোট ছেলে মার আঁচল ধরে আমার গা ঘেঁসে দাঁড়ালো। সবাইকে বললাম শোন –

ময়না আমার কলিজার টুকরা বোন। আমাদের সংসারে আমি বাবা মা আর ছোট বোন ময়না। বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স এগার আর ময়নার পাঁচ। সংসারে তখন বড়ই অভাব। মা কষ্ট করে গরু ছাগল হাঁস মুরগি পুশে সংসার চালাতো। আমার ছাড়া ময়না কিছুই বোঝেনা। আমি ওর বন্ধু খেলার সাথী। কোকিলের মত যে কত কথা বলে, তা বলে শেষ করা যাবেনা। আমি ওর ধ্যান আমি ওর ঞ্জান। ওকে একবিন্দু না দেখলে আমারও ভালো লাগেনা। জড়িয়ে ধরলে মনে হোত ওর শরীরে কোনো হাড় নেই। মোমের মত হাতের আঙ্গুলগুলি। সোনার বরণ বোনটি আমার ময়না পাখির মত তার কন্ঠ। একদিন মাকে বললাম মা- আজ থেকে আমার এ লক্ষী বোনটির আরও একটা নাম দিতে চাই। মা বললো তোর যা খুশি তা কর। বললাম আজ থেকে ওর নাম দিলাম ‘ময়না’। তুমি আর আমিই ওকে ময়না বলে ডাকবো। ময়না নাম দেয়াতে কি যে খুশি। দুহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে মার কাছে গিয়ে বলে মা মা আমি ময়না ? মা বলে হ্যাঁ তুই ময়না। সেই থেকে আমার আর মার কাছে ‘ও’ ময়না।

সংসার চালাতে গিয়ে মার কষ্ট দেখে ভালো লাগেনা। মনে মনে ঠিক করলাম কিছু একটা করবো। একদিন রাতে ঘুমাতে গিয়ে মাকে বললাম, মা – , বললো কি ? একটা কথা বলবো, বল। আমি শহরে যেতে চাই একটা কাজের জন্য। মা শুনে বললো শহরে তোর কে আছে যে তোকে কাজ দেবে ? তোকে কাজ করতে হবেনা। পড়াশুনা কর। বাপের স্বপ্ন তোকে পূরণ করতে হবে । বললাম মা শহরে দিনে কাজ এবং রাতে পড়াশুনা করা যায়। তুমি একদম চিন্তা করনা । বাবার স্বপ্ন আমি ঠিকই পূরণ করবো। সংসারের যে অবস্থা সেখানে আমার কিছু একটা করা দরকার। মাকে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজী করলাম শহরে যাওয়ার ব্যাপারে। শহরে যাওয়ার খবর শুনে ময়না ভীষণ খুশি। ওর লাপালাফি দেখে মা ওকে ধমক দেয়। অনেক রাত হয়েছে ঘুমা।

১৯৭১ সালের ৭ জানুয়ারী আমি শহরে আসি। গ্রামের এক ভায়ের সাথে দেখা হয় সে-ই আমাকে মাসে ৩০ টাকা বেতনে আবু বকর সিদ্দিক চাচার মটর গেরেজে চাকুরীতে ঢুকান।


ছিদ্দিক চাচা বড় ভালো মানুষ। আমাকে নিজ ছেলের মত দেখতো। মাকে আমার চাকরীর খবর দিলাম। শুনে খুশি হলেও মনে মনে যে খুশি হননি তা বুঝতে পারি। ময়না শুনে খুবই খুশি। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়তাম। মনে মনে পণ করলাম পড়াশনা করে একদিন মায়ের আশা পূরণ করবোই। ছিদ্দিক চাচা আমার কাজ দেখে একমাস পরে ১০ টাকা বেতন বাড়িয়ে দিলো। ফেব্রুয়ারী মাসে মার কাছে ৪০ টাকা ও ময়নার জন্য কিছু খেলনা পাঠালাম । মা বলেছিলো খেলনা পেয়ে ময়না খুব খুশি হয়েছিল । মনে মনে অনেক স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। ঠিক করলাম মার্চ মাসের বেতন পেয়ে চাচাকে বলে দুদিনের জন্য বাড়ীতে গিয়ে ঘুরে আসব। বাড়ী থেকে এসে রাতের একটা স্কুলে ভর্তি হব। এই সব চিন্তা করছি এমন সময় চাচা এসে বললো হ্যারে খোকা, দেশের কি কোন খোঁজ খবর রাখিস। সবাই আমাকে আব্দুল গফুর বললেও চাচা আমাকে খোকা বলে ডাকে। আমি বললাম, কেনো চাচা দেশের কি হয়েছে। চাচা বললো, মানুষজন বলছে পশ্চিম পাকিস্থানের শাসন আর মানবে না। শেখ সাহেব বলছে পূর্ব পাকিস্থানের মানুষের অধিকার থেকে পশ্চিম পাকিস্থান সরকার নানাভাবে বঞ্চিত করছে। চাকরীর ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে বন্টনের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্থান সরকার, পূর্ব পাকিস্থান মানুষের উপর বৈষম্য মূলক আচারণ করছে। পশ্চিম পাকিস্থান সরকারের এ আচারণ এ অঞ্চলের মানুষ মানেনা, মানবেনা। শেখ সাহেবের নেতৃত্বে শহরে শহরে মিছিল হচ্ছে। আমি বললাম, কই চাচা এসবের খবর তো জানিনা। চাচা বললো, সাবধানে থাকিস বাবা, বলে বাসায় চলে গেলো। আমি দোকানের সাটার টেনে ঘুমায়ে পড়লাম।

পরদিন চাচা দোকনে আসলে চাচাকে বললাম, মার্চ মাসের বেতন নিয়ে কয়েক দিনের জন্য বাড়ীতে যেতে চাই। চাচা সম্মতি দিলেন। অল্প দিনের মধ্যে ছিদ্দিক চাচা আমাকে নিজ সন্তানের মত ভাবতে লাগলেন। বড় ভালো মানুষ। বয়স হয়েছে। শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছেনা । তারপর ছেলে মেয়েরা যে যার মত আলাদা। আমার উপর অনেকটা নির্ভরশীল। প্রায়ই আমার মা আর বোনটির কথা জানতে চান। মার্চ মাসের ৩ তারিখ চাচাকে বলে গ্রামের বাড়ীতে রওনা দিলাম। চাচা বেতনের সাথে আরও ২০০ টাকা দিলেন। টাকাগুলি পেয়ে সেদিন এতো খুশি হয়েছিলাম তা বোঝাবার নয়। মার জন্য একটি শাড়ী, ময়নার জন্য জামা, একটা পুতুল আর মিষ্টি মিঠাই নিয়ে বাড়ীতে রওনা দিলাম। বাড়ীতে পৌঁছে আমাকে দেখে ময়না এক দৌড়ে বুকে এসে ঝাপিয়ে পড়ে। জড়িয়ে ধরে ভীষণ আদর যতœ করলো । পুতুল পেয়ে আরও খুশি। অনেক দিন পর বাড়ীতে আসলাম। মা আমার জন্য এটা সেটা নানান বিছু বানালো। মার পাশে বসে খাচ্ছি আর মাকে ছিদ্দিক চাচার কথা বললাম। চাচার কথা শুনে মা খুশি হলেন। তার জন্য দোয়া করলেন। মাকে বললাম, মা এবার শহর থেকে এসে ঘরের কাজটা ধরবো। ময়নাকে একটা স্কুলে ভর্তি করবো। আর আমি শহরের একটা নাইট স্কুলে ভর্তি হবো। তোমাকে আর এতো কাজ করতে হবেনা। মা আমার কথা শুনে অনেকটা না খুশির মত বললো, হয়েছে হয়েছে খেয়ে নে।


এই বয়সে মুরব্বীদের মত কথা। আল্লাহর কাছে দোয়া করি সুস্থ্য রাখুক। বড় হ। তারপর এসবের চিন্তা করিস। মনে মনে ভাবলাম সপ্তাহখানিক পরে শহরে যাব। মাকে বললাম। মা শুনে বললো দেরী করে গেলে অসুবিধা হবেনা। বললাম না। মার সাথে এসব বিষয় যখন কথা বলছি এর মাঝে ছিদ্দিক চাচা খবর পাঠলো বাবা তাড়াতাড়ি শহরে এসো। শহরের অবস্থা ভালোনা। শেখ সাহেব ৭মার্চের ভাষণে পশ্চিম পাকিস্থান সরকারের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষকে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার আহবান জানিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পশ্চিম পাকিস্থান সরকারের বিরুদ্ধে নানান শ্লোগান দিচ্ছে। তুমি বাবা একটু তাড়াতাড়ি এসো। মা সব ঘটনা শুনলো। ভয় পেয়ে বললো তোকে এই গন্ডগোলের মধ্যে শহরে যেতে হবেনা। বললাম তা হয়না মা । আমার কিছু হবেনা। আমার নিয়ে চিন্তা করনা। চাচার কথা ভেবে মা আর আপত্তি করলো না। পরের দিন শহরের উদ্দেশে রওনা দিলাম। চাচার জন্য মা দুটো নারিকেল, মুড়ি, গাছের পাকা কলা এটা সেটা নানান কিছু এক পুটলি ভরে দিলো। শহরে যাওয়ার কথা শুনে ময়নার কি লাফানি। কি আনন্দ। ওর আনন্দ দেখে কে ? ভাই-ভাই তুমি শহরে যাবে ? বললাম হ্যারে হ্যাঁ। এবার শহর থেকে আসার সময় আমার জন্য একটা লাল লিপিস্টিক আনবে বলে – দৌড়। ঘর থেকে চিরুনী এনে মাথার চুল আচড়ানো, জুতা এনে দেয়া, গালে আদর দেয়া ওর ব্যস্ততা দেখে কে। মা সব কিছু গোছায়ে দিল। ময়না আমার ঘাড়ে । মার হাতে পুটলি। বাড়ী থেকে রেলস্টেশন আধা কিলোমিটার । গাড়ীতে না উঠা পর্যন্ত মা আমার সাথে সাথে স্টেশন পর্যন্ত যাবে। গাড়ী না আসা পর্যন্ত স্টেশনে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়ছে আর গায়ে ফু দিচ্ছে। স্টেশন পর্যন্ত ঘাড়ে করে আসার সময় ময়নার লাল লিপিস্টিক এর সাথে যোগ হলো লাল শাড়ী,ফিতা, লাল কাচের চুড়ি, আলতা ইত্যাদি। তার সাথে কত উপদেশ। ভাই ঠিকমত খাবে। দুষ্ঠমি করবেনা। চুল আচড়াবে আরও কতকি বলে শেষ করা যাবেনা। আমি বললাম ঠিক আছে বুবু দুষ্ঠমি করবোনা। দুর থেকে গাড়ী আসার আওয়াজ। মার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। মার চোখে পানি। আমিও চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। ময়না পাশ থেকে বুকে ঝাপিয়ে পড়ে। দুগালে সে কি আদর। মার দেখে ও কেঁদে উঠলো। বুকে জড়িয়ে আদর দিয়ে বললাম লক্ষী বুবু আমার কাঁদেনা। মায়ের সাথে সাথে থেকো। কোথাও যাবেনা। মাকে বললাম মা, ময়নাকে চোখে চোখে রেখো । গাড়ী এসে থামল। আমার বুক থেকে ময়নাকে কোলে নিল মা। ওকে বললাম, ভালো থেকো বুবু । এবার আসার সময় তোমার সব জিনিস আনব। ময়না মাথা নাড়ালো । আমি গাড়ীতে পা রাখলাম। দুর থেকে দেখলাম মার কোলে ময়না আমার গাড়ীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কলমীলতার মত তার একটা হাত দুলায়ে দুলায়ে আমাকে বিদায় জানাচ্ছে।


আস্তে আস্তে ময়না আর মাকে ফেলে গাড়ী শহরের বুকে রওনা দিলো। চোখের পানি পড়তে লাগলো।
শহরে আসলাম। এসে দেখি ছিদ্দিক চাচা অসুস্থ। আমাকে দেখে চাচা খুবই খুশী হলেন। মা আর বোনটি কেমন আছে জানতে চাইল। বললাম ভালো আছে। চাচা বললেন শহরের অবস্থা মোটেই ভালোনা। সাবধানে থেকো। একটা নাইট স্কুলে ভর্তি হলাম। সত্যিই শহরের অবস্থা ভালোনা। চারিদিকে থমথমে পরিস্থিতি। শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষনা করেছে। পাক সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লেগে গেলো। শহর থেকে যুদ্ধ গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। মা আর ময়নার জন্য মন কেঁদে ওঠে। ওরা ছাড়া তো আমার কেউ নেই। বাড়ীর জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠলো। এদিকে ছিদ্দিক চাচা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চারিদিকে তুমুল যুদ্ধ। পাক বাহিনী শহর ও গ্রামে আক্রাম শুরু করে। গ্রামের পর গ্রাম পাক বাহিনী পুড়িয়ে দিচ্ছে। মনটা ছটফট করতে লাগলো। এরই মাঝে খবর পেলাম মা আর ময়না ভালো আছে। মা খবর পাঠালো গ্রামে পাক বাহিনী প্রায়ই আসে। সবাই আতঙ্কে । তুই বাবা সাবধানে থাকিস।

নভেম্বর মাস । মাকে জানালাম, ডিসেম্বর মাসের বেতন নিয়ে বাসায় আসব। চিন্তা কর না। খবর পেয়ে ময়না আর মা যার পর নেই খুশি। একে একে ময়নার জন্য সব জিনিসগুলো কিনলাম। ডিসেম্বর ৭ তারিখে সকালে খবর পেলাম গত রাতে পাক বাহিনী শহীদুল রাজাকারের পরামর্শে আমােেদর গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। শুনে ঞ্জান হারায় ফেললাম। চাচা জলদি বাড়ীতে যাওয়ার জন্য বললেন। ডিসেম্বর ৮ তারিখে প্রামে গিয়ে দেখি গ্রাম পুড়ে ছারখার। মানুষ গরু ছাগল মরে একাকার। লাশ আর লাশ। নিজের ঘরের কাছে গিয়ে দেখি ঘর পুড়ে ছারখার। জনম দুখী মা আর কলিজার টুকরো বোনটি আর নেই।, আমার ভালোবাসা আমার সোনার ময়না বেঁচে নেই্। সেদিনের সেই দৃশ্য উহু ভাইরে কি যে মর্মান্তিক, কি যে কষ্টের, বেদনার তা বলে বুঝাবার নয়। চারিদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। কোন স্বজন নেই। কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়ে, চোখের জলে জনম দুখী মা আর কলিজার টুকরা সোনার ময়নাকে চিরবিদায় জানালাম।

সেই থেকে মা আর ময়না আমার স্মৃতির মনি কোঠায় চিরভাস্বর। ময়নার জন্য কেনা জিনিসগুলো স্মৃতি হিসেবে একটি বাক্স্রের মধ্যে রেখে দিয়েছি। লাল সবুজের কাপড় দিয়ে বাক্সটি মুড়িয়ে ২য় তলার একটি রুমে মার কোরান শরীপ রাখার তাকের পাশে ৪৬ বছর ধরে রাখা । কাপড়ের উপর লিখে রেখেছি “ময়নার বাক্স”।

রচনা: মোঃ সাইরুল ইসলাম
উপ-পরিচালক
বাংলাদেশ ব্যাংক,প্রধান কার্যালয়,ঢাকা।