৭ মার্চের কণ্ঠ বুলেটে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জ্বীবিত হয় মানুষ

Share Button

নাজমুল হক :: ৭ মার্চ বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের শুরুর দিন। পাকিস্তানি হায়নাদের বিরুদ্ধে মুক্তির বার্তা নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে এ দিন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভাষণ, পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষণ।

এটি এমন একটি কালজয়ী, বীরত্বপূর্ণ, গৌরবগাঁথা, তেজদীপ্ত, সাবলীল ভাষণ যার চাহিদা পৃথিবীর বুকে যুগ যুগ ধরে থাকবে, শোনার আকাক্সক্ষা কখনও শেষ হবে না।

এ ঐতিহাসিক ভাষণ মিশে আছেন বাংলার সাথে, বাঙালির জাতীয়তাবাদের সাথে, মিশে আছেন এদেশের সংস্কৃতি, ভাষা, কবিতা ও গানের মাঝে। জাতিসংঘের ইউনোস্ক স্বীকৃতি দেওয়ায় বিশ্বের বুকে নতুন বাংলাদেশ জেগে উঠেছে ভাষণের মধ্য দিয়ে।

পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের নেতাকর্মীরা অধিকার আন্দোলন, দাবী আদায়, স্বাধীনতা রক্ষায় ভাষণ প্রদান করেন। সময়, অবস্থা ও কার্যক্ষেত্রে প্রত্যেকটি ভাষণ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। ব্যক্তি-গোষ্ঠি বিশেষে ভাষণ দলের, সমাজের, দেশের নিয়ে হয়ে থাকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল বাঙালি সত্ত্বার নিয়ে।

বুলেট-বোমার ভয়ে ভীত না হয়ে লক্ষ লক্ষ জনসমুদ্রের সামনে বজ্রের ন্যায় ভাষণ প্রদান করেন তিনি। বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার আহবানে শেখ মুজিব বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, তোমাদের কাছে হুকুম রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো…, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ…’, ‘যতদিন আমার দেশের মুক্তি না হবে, ততদিন খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হলো। কেউ দেবে না…’, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র শুরু হয় এর মধ্য দিয়ে। এই ভাষণে সমগ্র বাঙালি জাতি জাগ্রত হয়। নতুন করে স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানুষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে মুক্তির দিশা খোজে। নতুন করে বাঁচার স্বপে বিভোরিত হয় শাক্তিপ্রিয় বাঙালি জাতি। ভাষণের চার দশক পার হলেও এই ভাষণ এখনও মানুষকে আন্দোলিত করে, শিহরিত করে তোলে। নতুন করে অধিকার আদায়ের পথ দেখায়। নতুন করে বাঁচতে শেখায়, আধিকার আদায়ের দূঢ় হতে শেখায়।

মূলত বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী এই ভাষণের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়। পান্টে যেতে থাকে তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতির সকল হিসেব-নিকেশ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৭ মার্চ সকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড ৩২ নম্বরে গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করে জনসভায় স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। এ অবস্থায় জনসভামূখী পাকিস্তানি দস্যুদের ট্যাংক, কামান, মেশিনগানকে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ মার্চ তার মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। চকমকে দেন সমগ্র পৃথিবীর বাঘা বাঘা নেতাদের।

গত চার দশকে এই ভাষণ নিয়ে অসংখ্য মানুষ আলোচনা করেছেন। অনেকে তত্ত্ব আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। ভাষণের ভিডিও চিত্র দেখলে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সাবলীলভাবে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মতন সবকিছু বলে গেছেন। স্বাধীন দেশের সরকার প্রধানের মতোই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সরকারকে খাজনা-ট্যাক্স দেয়া বন্ধ করে দেন। তিনি ভাষণের মাধ্যমে মানুষকে দেশ প্রেমে উদ্ভুত হওয়ার পাশাপাশি অন্যায়ের প্রতিবাদ করার আহবান জানান। তিনি জাতিকে তার অবর্তমানে কি করতে হতে পারে তারও দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি জাতির কান্ডারী হয়ে আসেন, জয় করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইঙ্গিত দেন।

তিনি যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়ে সকলে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানান। শেখ মুজিব এমন একজন নেতা, যিনি সাড়ে সাত কোটি মানুষকে শুধু স্বাধীনতার মন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ করেননি, গোটা জাতিকে একজন অভিভাবকের মতো ‘তুমি’ করে বলার গৌরব অর্জন করেছিলেন। ২০০৪ সালে বিবিসি’র বিশ্বব্যাপী শ্রোতা জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। বাঙালিরা বিশ্বাস করে মহাকালের ইতিহাসে মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ একদিন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণে পরিণত হয়েছে। আমাদের তার ভাষণ থেকে রাজনৈতিক দুরদর্শীতার শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী রাজনীতির এই দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে আদর্শ মনে করে জাতিকে আরো একবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এখনই।

লেখক: সভাপতি, ল স্টুডেন্টস ফোরাম, সাতক্ষীরা






সঙ্গতিপূর্ণ আরো খবর

  • একাদশ সংসদের জটিল সমীকরণ!
  • ভয়ঙ্কর রাক্ষসীর মায়াবী জাদুর ফাঁদ!
  • বিজ্ঞাপন শিল্পে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
  • শ্যামনগরে আকাশ লীনা ইকো টুরিজম দেখতে পর্যাটকদের উপচে পড়া ভিড়
  • কিংবদন্তি এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী
  • গ্রামেও এখন মোবাইলে গেম খেলার নেশা চলছে
  • বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ