যে নামায পড়ে, যে পড়ে না

Share Button

অনলাইন ডেস্ক :: রজব মাসের একটি বড় ফজিলত এই যে, এই বরকতময় মাসে নবী করীম সা. কে মেরাজে নামাযের ফরযিয়াতের হুকুম দেওয়া হয়েছে। কেবল নামাযই ইসলামের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি রোকন, যা ফরয হবার ঘোষণা যমিনে না হয়ে বরং সপ্তআকাশের ঊর্ধ্বে উঁচু এবং সম্মানিত স্থানে মেরাজের রাতে হয়েছে।

এমনকি এর হুকুম হযরত জিবরাঈল আলাইহিসসালাম এর মাধ্যমে নবিয়ে আকরাম সা. পর্যন্ত পৌঁছেনি- বরং আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা ফরয পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের বিধান নিজেই তাঁর হাবিব রাসুলুল্লাহ সা. কে উপহার দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআনুল কারিম এবং রাসুলুল্লাহ সা. এর হাদিসে নামাযের গুরুত্ব ও ফযিলত অধিক পরিমাণে উল্লেখিত হয়েছে। যেখানে নামায কায়েম করার উপর বিশাল প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি ও সুসংবাদ আর নামায ছেড়ে দেওয়ার কারণে কঠিন শাস্তির কথা ঘোষিত হয়েছে।

নামায ঈমানের পর ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোকন ও বিধান। কুরআন এবং হাদিসে এই জরুরী ও বুনিয়াদি ফরয বিধান যথাযথরুপে আদায়কে অধিক গুরুত্বের সাথে বারংবার আলোচনা করা হয়েছে। শুধু কুরআনুল কারিমেই প্রায় ৭ শত বার- কখনো স্পষ্ট, কখনো বা ইশারায় বিভিন্নভাবে নামাযের আলোচনা পাওয়া যায়।

নামায আদায় সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে সূরা আনকাবুতের ৪৫ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা বলেন, “আপনার উপর যে কিতাব ওহী হিসেবে প্রত্যাদিষ্ট হয়েছে, আপনি তা পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন। নিশচয়ই নামায যাবতীয় নির্লজ্জ ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।”

নামাযের মধ্যে আল্লাহ তা’আলা এই বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব রেখে দিয়েছেন যে, নামাযি ব্যক্তিকে নামায যাবতীয় পাপাচার ও মন্দ কাজ হতে বাধা প্রদান করবে। যেমনটা হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের জাতি বুঝেছিল- যখন তারা দেখল, তাদের মধ্য থেকে কেবল শুয়াইব-ই মূর্তি পূজা করে না, মাপে কম দেয় না এবং অন্যান্য সমস্ত মন্দ থেকে বেঁচে থাকে আর তাদেরকেও মন্দ থেকে বাঁচার কথা বলে, মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করতে বলে। তারা লক্ষ্য করলো তাদের মাঝে আর শুয়াইবের মাঝে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা হল শুয়াইব নামায আদায় করে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “তখন তারা শুয়াইব আ. কে জিজ্ঞেস করল, হে শুয়াইব, আপনার নামাযই কি আপনাকে এই আদেশ দেয় যে, আমরা ঐসব উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব যাদের উপাসনা আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা করত? অথবা আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত যা কিছু করে থাকি, তা ছেড়ে দেব?” (সূরা হুদ-৮৭)

তবে আবশ্যক যে, ব্যক্তি নামায আদায়ে ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সাথে নিয়মিত হতে হবে। এবং নামায আদায় করতে হবে সে সকল শর্ত ও আদবের সাথে যা- নামায আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য আবশ্যক। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সা. এর খিদমতে এসে বলল, অমুক ব্যক্তি রাতে নামায আদায় করে আর ভোরে উঠে চুরি করে। রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, শীঘ্রই তার নামায তাকে ঐ বড় কাজ হতে ফিরাবে যার কথা তুমি বলেছ। (মুসনাদে আহমদ)

সূরা বাকারার একশত ৫৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “হে ইমানদারগণ, তোমরা সবর ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারিদের সাথে আছেন।”

যখনই কোন পেরেশানি অথবা মুসিবত সামনে আসে তখন মুসলমানদের এর উপর সবর করা এবং নামাযের বিশেষ ইহতিমাম (সযত্ন গুরুত্বদান) করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা চাই। রাসুলুল্লাহ সা. ও প্রত্যেক দুশ্চিন্তার সময়ে নামাযে মনোনিবেশ করতেন। হাদিসে এসেছে, হযরত হুযাইফা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, তখনই তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন।

রাসুলুল্লাহ সা. পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায ছাড়াও তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, আউয়াবিন, তাহিয়্যাতুল অযু ও তাহিয়্যাতুল মসজিদ- এ সকল নামাযগুলোরও ইহতিমাম করতেন। এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে স্বীয় প্রতিপালকের কাছে তাওবাহ ও ইস্তিগফারের জন্য নামাযকেই মাধ্যম বানাতেন। সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের সময়েও তিনি মসজিদে চলে যেতেন।

ভুমিকম্প, অন্ধকার অথবা তুফান এমনকি জোরে বাতাস বইলেও তিনি মসজিদে গিয়ে নামাযে নিমগ্ন হতেন। অভাব আসলে অথবা অন্য কোন দুশ্চিন্তা বা পেরেশানি অথবা কোন কষ্ট পেলে মসজিদে চলে যেতেন। সফর থেকে ফিরতেন, তখনও প্রথমে মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করতেন। তাই আমাদেরও নামাযের এমন বিশেষ ইহতিমাম করা চাই। এবং যে কোন দুশ্চিন্তা, বিপদ বা অভাব-অনটনের অবস্থায় বেশি বেশি নামায আদায় এবং সবরের মাধ্যমে আল্লাহ থেকে সাহায্য কামনা করা চাই।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে জানতে চাইলাম, কোন আমল আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়? রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, নামায যথা-নির্ধারিত সময়ে আদায় করা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, এরপর কোন আমল আল্লাহ বেশি পছন্দ করেন? আল্লাহর রাসুল জবাব দিলেন, পিতা-মাতার অনুগত থাকা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কোন আমল আল্লাহর অধিক পছন্দ? রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। (বুখারি, মুসলিম)

হযরত আওফ ইবনে মালেক আশযাঈ রা. বলেন, আমরা একদিন রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে বসেছিলাম, তিনি ইরশাদ করলেন, “তোমরা কি আল্লাহর রাসুলের কাছে বাই’আত হবে না?” এ কথা আল্লাহর রাসুল তিনবার বললেন। তখন আমরা বাইআতের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম এবং বাইআত হলাম। আমরা রাসুলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কোন জিনিসের উপর বাইআত হলাম? রাসুল সা. বললেন, “শুধু আল্লাহর ইবাদত করো আর তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না, এবং নামাযের পা-বন্দি করো”। এরপর তিনি স্বল্প আওয়াজে বললেন, “মানুষের কাছে কখনো কিছু চেয়ো না”। (আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাযাহ, মুসনাদে আহমদ)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, একদিন নবী করীম সা. নামাযের আলোচনা করতে নিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি নামাযের ইহতিমাম করে নামায তার জন্য কেয়ামতে নূর হবে, তার (পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার) দলিল হবে এবং কেয়ামত দিবসে আযাব থেকে বাঁচার কারণ হবে। আর যে ব্যক্তি নামাযের ইহতিমাম করে না, নামায তার জন্য নূরও হবে না, (পূর্ণ মুমিন হওয়ার) দলিলও হবে না এবং আযাব থেকে বাঁচার কারণও হবে না। আর কেয়ামত দিবসে তার স্থান হবে ফেরাউন, কারুন, হামান এবং উবাই ইবনে খালফের সাথে। (সহিহ ইবনে হিব্বান, তাবারানি, বাইহাকি, মুসনাদে আহমাদ)

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. তার ‘কিতাবুস সালাত’ নামক গ্রন্থে বলেন- ফেরাউন, হামান, কারুন ও উবাই ইবনে খালফের সাথে হাশর হওয়ার কারণ হল, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঐ সকল কারণেই নামায আদায়ে অলসতা বা গাফলতি আসে, যা আল্লাহর অবাধ্য এই লোকগুলোর মাঝে পাওয়া যায়।

অতএব, নামায আদায়ে ব্যক্তির অলসতার কারণ যদি হয় ধন-সম্পদের আধিক্য, তাহলে তার হাশর হবে কারুনের সাথে। যদি এর কারণ হয় ক্ষমতা ও রাজত্ব, তাহলে তার হাশর হবে ফিরআউনের সাথে। যদি এর কারণ হয় কর্মকর্তৃত্ব বা মন্ত্রিত্ব, তাহলে তার হাশর হবে হামানের সাথে। আর যদি এর কারণ হয় ব্যবসা-বানিজ্য, তাহলে তার হাশর হবে উবাই ইবনে খালফের সাথে।

যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও কখনো নামাযই পড়ে না বা হঠাৎ কখনো কখনো পড়ে নেয়, সে যেন একটু চিন্তা করে তার শেষ পরিণতির কথা!

আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা ঐ চূড়ান্ত কঠিন পরিণতি ও পরিস্থিতি থেকে আমাদেরকে হিফাজত করুন, এবং আমাদেরকে ‘খুশু’ ‘খুজু’র সাথে জামাআতে নামায আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।



« (পূর্ববর্তী সংবাদ)



সঙ্গতিপূর্ণ আরো খবর

  • ইরানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৩৫তম আর্ন্তজাতিক কুরআন প্রতিযোগিতা
  • রাসুলুল্লাহ সা. রজব মাসে দু’আটি বেশি বেশি করতেন
  • পবিত্র শবে বরাত ১ মে
  • নলতা শরীফে পবিত্র শবে মেরাজ অনুষ্ঠিত
  • পবিত্র শব-ই মেরাজ শনিবার
  • সাতক্ষীরায় হাজী সম্মেলন অনুষ্ঠিত
  • আল্লাহর কাছে বান্দার চাওয়া-পাওয়া
  • লোভের পরিণাম