বিশ্ব নেতৃত্বের পথে তুরস্ক

Share Button

এক সময়ের সারা বিশ্ব শাসনকারী মুসলিম সভ্যতায় সমৃদ্ধ ইতিহাস ঐত্যিহের দেশ তুরস্ক। গত এক দশকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে তুরস্ক পৌঁছে গেছে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর কাতারে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট, রহিঙ্গা ইস্যু, ফিলিস্তিন মুসলিমদের প্রথম কেবলা বাইতুল মোকাদ্দাস ইস্যুগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় বিশ্বব্যাপী ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। সবমিলিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এখন শুধু তুরস্কের রাষ্ট্রনায়ক নয়, তিনি এখন বিশ্বে মহানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ-গুলোতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে প্রতিদিনই দেখতে হচ্ছে মানুষের অসহায়ত্বের দৃশ্য এবং তা শুধু যে মধ্যপ্রাচ্যকেই প্রভাবিত করেছেনা বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর কম-বেশি প্রভাব রয়েছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এই অস্থিরতা নিরসনে প্রানপন চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

বিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট ও মানবিক বিপর্যয় বিরাজ করছে সিরিয়ায়। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায়, টিভির পর্দায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখে পড়ে নারী, শিশুসহ অসংখ্য বেসামরিক নাগরিকের নিহত, আহত হওয়ার খবর। ২০১১ সালে গণতন্ত্রের দাবীতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ বিক্ষোভে উত্তাল যা ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত। এরই সুত্র ধরে ২০১১ এর মার্চে সিরিয়ার একনায়ক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পদত্যাগ ও দেশে একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে সিরিয়ার বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ শুরু করে। রাজধানী দামেস্কসহ বড় শহরগুলোয় বিরোধী দল ও সাধারণ জনতার বড় অংশ রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভকারীদের দমন করতে প্রেসিডেন্ট আসাদ সেনাবাহিনী নামিয়ে দেয়। সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে নিহত হতে থাকে বিক্ষোভকারীদের অনেকে। দিনে দিনে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। মানবিক দিক বিবেচনা করে তুরস্ক দশলক্ষের অধিক শরনার্থী আশ্রয় দেয়। বর্তমানে তুর্কি বাহিনী বাসার বাহিনীকে হঠিয়ে আফরিন এবং রাজো শহর নিয়ন্ত্রনে নেয়। যা তুর্কি বাহিনীর বিরাট সফলতা। বলা যায় এই সফলতা বিশ্বমোড়লদের চোখে আঙ্গুল ডুকিয়ে দিয়েছেন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযানে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট নিরসনে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। এর বাইরে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠে নিন্দা ও সমালোচনা করেছে তুরস্ক। আর তা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। একের পর এক বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের আন্তর্জাতিক কণ্ঠে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। বক্তব্য আর বিবৃতি দিয়েই ক্ষ্যন্ত হননি মিয়ানমারে মানবিক ত্রাণ পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে অনুমতি পেয়েছেন এরদোয়ান। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলে জাতিসংঘের সব ত্রাণ তৎপরতা বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যেই ৭ সেপ্টেম্বর তুরস্কের বিদেশি সহযোগিতা সংস্থা টিকা প্রথম দেশ হিসেবে রাখাইন অঞ্চলে ১ হাজার টন খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ পাঠিয়েছে। এছাড়া তুরস্ক বার বার বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক ত্রাণ বিতরণের ঘোষণা দিয়েছে। বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে যখন এরদোয়ানের স্ত্রী তুর্কি ফার্স্টলেডি এমিনি এরদোয়ান নিজেই বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের (ওআইসি) বর্তমান প্রধান হিসেবে কাজাখাস্তানে সর্বশেষ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের আচরণের নিন্দা জানিয়েছেন। এরদোয়ান নিজেই বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন সম্মেলনে। এর আগে এরদোয়ান রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছিলেন।

বর্তমানে আরেকটা বিষয় চরম আকার ধারন করছে, আর তা হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের নেতাদের মাঝে অনৈক্য। এরদোয়ান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মুসলিমদের ঐক্যের ব্যাপারে জোর প্রচেষ্ঠা চালাচ্ছেন। যা সৌদি সরকার করতে পারে নাই। এভাবে যেখানেই মুসলিমরা তাদের অধিকার হারা হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে সেখানেই এরদোয়ান তার পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োগ করেছেন। মুসলিম বিশ্বের জনগণের কাছে যেকোনও মুসলমানের অধিকারের জন্য এরদোয়ান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এরদোয়ান দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও গবেষণায় বিভিন্ন সংকটে মুহূর্তে নিজেই এই ভাবমূর্তি গড়ে তোলেছেন। যেমন ২০১১-১২ সালে মিসরে মুরসি শাসনামল বা ফিলিস্তিন। ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ার কারণে আরবি দৈনিক পত্রিকার ফিলিস্তিনপন্থী কলাম লেখকদের কাছে এরদোয়ান ‘নয়া নাসের’ হিসেবে পরিচিত পেয়েছেন।

বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের অধিকার রক্ষার জন্য এরদোয়ানের আহ্বান তুরস্কের কূটনৈতিক নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অন্যান্য মুসলিম দেশ তাকে অনুসরণ করবে, নাকি তুরস্কের তথাকথিত মানবিকতার রাজনীতিপ্রত্যাখ্যান করবে, তার ওপর নির্ভর করছে এরদোয়ানের মুসলিম বিশ্বের নেতা হয়ে ওঠা।
সালাহ উদ্দীন বিন নুরী।
শিক্ষার্থী মাস্টার্স (এমটিআইএস)।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।