ন্যানোপ্রযুক্তিতে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট বাড়ি

Share Button

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ডেস্ক :
মাইক্রো থেকে এখন ন্যানো’র দিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চোখ। প্রযুক্তি আর পণ্যকেও করে তোলা হচ্ছে সূক্ষ্মতর। কারণ ন্যানো প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে শুরু করে ইলেক্ট্রনিক পণ্যের ব্যবহার করবে সহজতর।

অঙ্কের হিসাবে এক মিটারের এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ হচ্ছে এক ন্যানো মিটার। আরো সহজ করে বলতে হলে, একটি চুলের আশি হাজার ভাগের এক ভাগ হচ্ছে এক ন্যানো।

সম্প্রতি ন্যানো প্রযুক্তির প্রকৌশলীদের অভুতপূর্ব একটি কাজ বেশ চমক সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সের একদল বিজ্ঞানী ন্যানোপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট বাড়ি বানিয়েছেন যা আকারে ২০ মাইক্রোমিটারের চেয়েও ছোট। অর্থাৎ আপনি একটি আলপিনের মাথায় এরকম ৫০টি বাড়ি দিয়ে একটি গ্রাম সাজিয়ে ফেলতে পারবেন।

বাড়িটির দেয়ালগুলো মাত্র ১.২ মাইক্রোমিটার পুরু যা ১ মিটারের এক মিলিয়ন ভাগের ১ ভাগের সমান। সুতরাং এরকম ৬০টি দেয়াল যদি আপনি একসঙ্গে জড়ো করেন তাহলে তা মানুষের চুলের চেয়েও পাতলা হবে।

আণুবীক্ষণিক এই বাড়িটি এক টুকরো অপটিক্যাল ফাইবারের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। আসলে কিছু অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং প্রযুক্তির নমুনা হিসেবে এটি তৈরি করা হয়। বেশ কিছু আণুবীক্ষণিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি আছে যার বিভিন্ন দিক উন্মোচনের জন্য গবেষকদল এরকম একটি নমুনা তৈরি করেছেন।

ফ্রান্সের ফেমটো-এসটি গবেষণাগারের গবেষকদলের সদস্য জিন ইভস বলেন, ‘প্রথমবারের মতো আমরা ২ ন্যানোমিটারের চেয়েও কম জায়গা নিয়ে একটি স্থাপনার কাজ করতে সক্ষম হয়েছি যা রোবটিক্স এবং অপটিক্যাল প্রযুক্তিতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এক টুকরো অপটিক্যাল ফাইবারের ওপর একটি ক্ষুদ্রকায় বাড়ি বানিয়ে আমরা দেখাতে চেয়েছি যে, এই সূক্ষাতিসূক্ষ প্রযুক্তি আমাদের হাতের নাগালেই রয়েছে এবং প্রয়োজনে অপটিক্যাল ফাইবারের ওপর যেকোনো কিছু স্থাপন করে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ঘটাতে আমরা সক্ষম।’

বাড়িটির মূল নির্মাতা হচ্ছে মিউরোবটেক্স নামক একটি রোবট। খুবই পাতলা সিলিকার টুকরো দিয়ে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজটি একটি বায়ুশূণ্য চেম্বারের মধ্যে করা হয়। খুবই সূক্ষ আয়ন বিমের মাধ্যমে গবেষকগণ অপটিক্যাল ফাইবার কেটে তাতে বাড়িটির আকৃতি বসিয়ে দেন। নির্মাণ কাজটি বায়ুশূন্য পরিবেশে করা হয় বলে বাড়িটির দেয়ালগুলো আপনাআপনিই দাঁড়িয়ে যায়। গবেষক দলটি রোবটটিকে একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালনা করেন এবং এমনকি তারা বাড়িটির ছাদের কিছু অংশ কেটে দেখাতেও সমর্থ হয়েছিলেন। একটি গ্যাস ইঞ্জেকশান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাড়িটির বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানোর কাজ করা হয়েছিল।

যদিও ফ্রান্সের এই গবেষকদল নমুনাস্বরূপ ক্ষুদ্রকায় এই বাড়িটি বানিয়েছেন, কিন্তু তাদের এই গবেষণা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম। মানবদেহের রোগ নির্ণয়, অত্যাধুনিক শক্তিশালী সেন্সর তৈরি, মানবদেহের বিভিন্ন সূক্ষ অস্ত্রোপচারের মতো কাজ এই ন্যানোপ্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব। অতি আণুবীক্ষণিক ন্যানো কণিকা মানবদেহের অনেক সূক্ষ জায়গায় পৌঁছাতে সক্ষম এবং এই কণিকার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়, দেহের ভিতরে ওষুধ পাঠানোর মতো জটিল কাজও করা সম্ভব। ন্যানো প্রযুক্তি অদূর ভবিষ্যতে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের এক নতুন দ্বার উন্মোচন করতে চলেছে। এ কারণে বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তিকে আরো নিখুঁত এবং কার্যকরীভাবে ব্যবহার করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।

তাছাড়া ন্যানো প্রযুক্তির সাহায্যে বর্তমানে হিসাব-নিকাশের কাজ আরো সূক্ষভাবে করা হচ্ছে। তথ্য এবং উপাত্ত সংরক্ষণের যন্ত্র ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে তৈরি করা হচ্ছে যাতে বিপুল পরিমাণ তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায়।

ফ্রান্সের এই গবেষকদলটি তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে আরো বিস্ময়কর কিছু তৈরি করতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে তারা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করে আরো ক্ষুদ্র একটি বাড়ি বানাবেন যা কিনা আকারে এক মিটারের কয়েক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ হবে এবং তা আগের বাড়িটির জানালা দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে!

তথ্যসূত্র : সায়েন্স অ্যালার্ট