দারিদ্র বিমোচনের মডেল খুলনার থুকড়াবাসী

376
‘আমার স্বপ্ন আমি যাকাত দেব, আর নেব না’। হতদরিদ্র ভ্যান চালক শহীদুল ইসলাম গাজী এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে দৃঢ়চিত্তে বলেন, যাকাত দেয়ার মত সামর্থ না থাকলেও অন্তত সচ্ছলভাবে আমার পরিবার চলতে পারে এমনটি এখন শুধু প্রত্যাশা নয়, রয়েছে আমাদের আত্মবিশ্বাস। অথচ কিছুদিন পূর্বেও তার দিন আন্তে পান্তা ফুরায় অবস্থা ছিল। অসুস্থতা কিংবা কোন সমস্যা হলে তার কর্জ করেই সমাধান করতে হতো। কথা বলছিলাম ডুমুরিয়ার থুকড়া দরিদ্র ভ্যান চালক শহীদুল ইসলাম গাজী সাথে।
একই গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বিশ্বাস ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায়। দিন আনে দিন খায়। স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে চার জনের সংসার। দুই মেয়ের মধ্য বড় মেয়ে বাক প্রতিবন্ধী। ছোট জন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। তিনি বলেন, কাজে যেতে না পারলে খাবার জুটতো না পরিবারের। দিনভর ভ্যান চালিয়ে যে আয় হতো তা দিয়েই চলছিল সংসার। কোন রকম সঞ্চয়ের সুযোগ ছিল না। ভ্যানটিও অনেক পুরাতন হওয়ায় চালাতে সমস্যা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। নতুন ভ্যান কেনার সামর্থ না থাকায় চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এরই মাঝে হঠাৎ ঝড়ে বসত ঘরটিও উড়ে যায়। যা ছিল মরার উপরে খাড়ার ঘা। পরিবার পরিজন নিয়ে রান্না ঘরেই বসবাস শুরু করেন তিনি। টানা পোড়নের সংসারে তখন চলছিল হাহাকার। উল্লিখিত দুই পরিবার যখন হতাশায় নিমজ্জিত তখনই আশির্বাদ হয়ে সামনে আসে থুকড়া বায়তুস সালাম যাকাত কমিটি। একটি করে নতুন ভ্যান দেয়া হয় এ কমিটির পক্ষ থেকে। কমিটির উদ্দেশ্য যাকাত সংগ্রহ ও বন্টনের মধ্যদিয়ে দারিদ্রমুক্ত থুকড়া গড়া। নতুন দু’টি ভ্যান পেয়ে দু’টি পরিবারই মোটামুটি সচ্ছল হবার স্বপ্ন দেখছে। সম্প্রতি এ প্রতিবেদক থুকড়া গ্রামে গিয়ে কথা বলার সময় দু’ভ্যান চালক উল্লিখিত অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। আর কমিটির সদস্য আঃ হালিম গাজী জানান, সকলের যাকাত দেয়ার মত সামর্থ না হলেও অন্ততঃ সচ্ছলভাবে যাতে আমাদের গ্রামের সব পরিবার চলতে পারে এমন প্রত্যাশা নিয়েই যাকাত কমিটি গঠন করা হয়েছে ।
স্থানীয়রা জানান, থুকড়া বাজার সংলগ্ন বায়তুস সালাম জামে মসজিদে একদিন জুময়া’র খুতবা দিতে গিয়ে খতীব হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর যাকাত বন্টনের ওপর বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তার এ বক্তব্য অনেকের মানষিক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এরপর একদিন মসজিদ কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ আফজাল হোসেন উক্ত খতীবকে নিয়ে খুলনায় আলোচনায় বসেন। দু’জন প্রাথমিক আলোচনার পর এলাকায় গিয়ে আরও কয়েকজন মুসল্লির সাথে কথা বলেন। এভাবে ধীরে ধীরে সকলেই বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে নেন। এক পর্যায়ে ২০১৭ সালের রমজান মাসে থুকড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব হাফেজ সাইফুল্লাহ মানসুর যাদের যাকাত দেয়ার সামর্থ আছে এবং যাদের যাকাতের অর্থ প্রাপ্য সবারই তালিকা করার উদ্যোগ নেন। এদিন থেকেই যাকাতের সমবন্টন নিতিমালা বাস্তবায়নে ‘যাকাত ভিত্তিক সমাজ চাই-দারিদ্র মুক্ত দেশ চাই’ শ্লোগান নিয়ে থুকড়া বায়তুস সালাম যাকাত কমিটির কার্যক্রম শুরু। যাকাতের টাকা দিয়ে প্রথম দফায় উল্লিখিত দু’ব্যক্তিকে ভ্যান প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় দফায় চলতি বছরের ২৭ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে আরো ছয় জনকে তিনটি গরু ও তিনটি ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয় অসহায় হতদরিদ্র রাবেয়া খাতুন, রতœা খাতুন, মোঃ লিটন, বিধাবা আয়শা খাতুন, ইউনুস বিশ্বাস ও নাইট গার্ড বছির উদ্দিন এখন যাকাতের অর্থ দিয়ে সাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। গরু পেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নাইট গার্ড বছির উদ্দিন বলেন, দ্বিতীয়বার কোন সাহায্য না নিয়ে বরং পূর্বের ২ জনের মতোই আমরা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডুমুরিয়ার থুকড়া বায়তুস সালাম যাকাত কমিটিকে অনুসরণ করে কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় মসজিদ ও কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে যাকাত ভিত্তিক সমাজ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া সাতক্ষীরা গত বছর উদ্যোগ নিয়ে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো যাকাতের অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া রূপসার রহিমনগরেও যাকাত কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালির মোঃ নাজমুল আহসান বলেন, আমরা যাকাত কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হাফেজ সাইফুল্লাহ মানসুর ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে যাকাত কার্যক্রম চালুর প্রস্তুত নিচ্ছি। আশা করি খুব দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারবো। এই ব্যাপারে হাফেজ সাইফুল্লাহ মানসুর আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন।
থুকড়া বায়তুস সালাম যাকাত কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর বলেন, “বর্তমানে দেশে বেকার ও দারিদ্র্যতা প্রধান সমস্যা। আর অভাবের কারণেই দরিদ্র মানুষেরা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ থেকে জাতিকে রক্ষায় যাকাতভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। যদিও এর মূল দায়িত্ব হলো সরকার বা রাষ্ট্রের। কিন্তু বিকল্প এবং সম্পূরক ক্ষেত্র হিসেবে এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে আমরা এ কার্যক্রম শুরু করেছি। আর সরকারের পক্ষে স্থানীয় সরকার অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বররা এতে সহযোগিতা দিচ্ছেন। এটি গোটা সমাজ ব্যবস্থার ওপর বিরাট প্রভাব পড়বে এবং বেকার ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠনে বড় একটা ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি”।
প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “গত বছর খুলনায় যে ভিক্ষুকমুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে সে ক্ষেত্রেও যাকাতের যথাযথ ব্যবহার হলে খুব সহজেই ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে একটি মহল্লা বা গ্রামভিত্তিক যাকাত দাতা ও যাকাত প্রাপ্যদের তালিকা করে সেগুলো সঠিকভাবে বন্টন হলেই একদিকে যাকাতের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে অপরদিকে দারিদ্র বিমোচনের পাশাপাশি সকলেই স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে”। বিত্তবানেরা যাকাত দিয়ে সহযোগীতা করতে যোগাযোগ করতে পারেন এই নাম্বারে-০১৯১৩-৩৩৩২৩১ (প্রধান উপদেষ্টা)

শেয়ার করুন ..