হঠাৎ বেড়েছে ডলারের দাম!

422

হঠাৎ করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার। অস্বাভাবিক আমদানিতে বাড়ছে ডলারের চাহিদা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মার্কিন ডলারের দর বাড়ে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ টাকা। সে সুযোগে কিছু অসাধু ব্যাংক অতিমুনাফার লোভে বাড়িয়ে দিয়েছে বৈদেশিক এই মুদ্রার দাম।

ব্যাংক ও কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলার ৮৫ থেকে ৮৬ টাকা কেনাবেচা হয়। আর ব্রিটিশ পাউন্ডের দর প্রায় ৭ টাকা বেড়ে ১১০ টাকায় ওঠে। সোমবারও ডলারের সর্বোচ্চ দর ছিল ৮৬ টাকা ৪০ পয়সা। এতে আমদানিকারক ও ভোক্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে যে হারে আমদানি বাড়ছে সে হারে রফতানি ও রেমিটেন্স না বাড়ায় অর্থপাচারের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ দিনে শেষবেলায় ডলারের দাম পড়তে শুরু করে। সর্বশেষ ৮২/৮৩ টাকায় লেনদেন হয়। এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকার পরও হঠাৎ ডলারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির পেছনে কারসাজির শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বাজার মনিটরিংয়ের অভাবেই ডলারের দর বৃদ্ধির মূল কারণ। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের এমন মূল্য বৃদ্ধির কোনো কারণ খুঁজে পায়নি।

এদিকে বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ছিল ৫৪.৪৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে রফতানি আয় ৩৬.৬৬ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিটেন্স ১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুটো মিলিয়েও আমদানি ব্যয় সামলানো যায়নি। ডলার যাচ্ছে বেশি আসছে কম।

জানতে চাইলে অর্থনীতির গবেষক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমদানিতে কঠোর নজরদারি করা উচিত। আমদানি পণ্যের বদলে ইট-বালি এখন দৃশ্যমান। এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। কেন এত আমদানি, কী আসছে, কোথা থেকে আসছে-এসব খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া রফতানির সঙ্গে মিল রেখে আমদানি করা উচিত। কারণ আয়ের থেকে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ এত খেলে বদহজম হতে পারে। তাই খাওয়া কমাতে হবে।

বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে তফসিলি ব্যাংকের নির্বাহীদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসে। ওই বৈঠকে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বাজারের ডলারের সংকটের কথা বলা হয়েছে। এদিকে ডলারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির পেছনে কোনো ধরনের কারসাজির জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসায়ীরা ডলার মূল্য অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে বলেন, আমদানির তুলনায় রপ্তানিতে কম প্রবৃদ্ধি ও রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রবাহের কারণে বেশ কিছুদিন ধরে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম সামান্য বাড়ছে। তবে রমজান সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের আমদানি দায় পরিশোধের চাপ বাড়ায় সম্প্রতি হঠাৎ করে বেড়ে ডলারের দাম ৮৫ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

বিপুল অংকের আমদানির বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, অর্থপাচার হচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যে ব্যাপক ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে রিজার্ভে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, ক্রমাগতভাবে আমদানি বাড়ায় বাজারে ডলারের চাহিদা এবং দর বাড়তির দিকে। বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ২৩১ কোটি ১০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন-এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ডলারের দাম বেড়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমদানিকারক। একইসঙ্গে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। দ্রব্যসামগ্রীর দাম বেড়ে যাবে। সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও ডলার ছাড়তে হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক যে দামে ডলার বিক্রি করে বা কেনে তাকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার বলে। ব্যাংকগুলো এর চেয়ে কিছু বেশি দামে ডলার কেনাবেচা করে। সোমবার আমদানি পর্যায়ে ৮৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে ব্যাংকগুলো। খুচরা পর্যায়ে ডলারের সর্বোচ্চ দর ৮৬ টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ কিছু দিন আগেও ডলারের দাম ছিল ৭৮ থেকে ৮০ টাকা।

এদিকে রমজানকে সামনে রেখে ডলার মূল্যের এই অস্থিরতায় শঙ্কিত করে তুলেছে ব্যবসায়ীদের। যারা ইতিমধ্যে রোজার পণ্য আমদানির জন্য এলসি করেছেন তারাই বেশি শঙ্কিত। আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডলারের এই অস্থিরতা আগামী রমজানে পণ্য মূল্যের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সোমবার বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক সর্বোচ্চ ৮৬ টাকা ৪০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে। এছাড়া সিটি ব্যাংক এনএ ৮৫ টাকা ৭৫ পয়সা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ৮৫ টাকা ৭৫ পয়সা ও একটি ইসলামী ব্যাংক ৮৫ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে। এ প্রসঙ্গে চাইলে ফরেন এক্সচেঞ্জ বিশেষজ্ঞ ও কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী হোসেন প্রধানিয়া যুগান্তরকে বলেন, ডলারের দাম এত পার্থক্য থাকার কথা নয়। কেউ করে থাকলে ঠিক করছে না। তিনি বলেন, এটা সাময়িক হতে পারে। ঠিক হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের দাম কমানোর জন্য অন্য সব ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে। ডলারের বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যাংক কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম বাড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে আন্তব্যাংক ডলারের গড় দরের সঙ্গে আমদানিতে ২ টাকার বেশি না নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, হঠাৎ টাকার অবমূল্যায়ন হলো অর্থাৎ ডলারের দাম বেড়ে গেল আবার হঠাৎ কমে গেল এটা মার্কেট ফোর্সের জন্য হয়নি। অস্থিরতাটা অস্থায়ী। আরও কারণ আছে এর পেছনে। তথ্যের অসামঞ্জস্যতা, বাজার পর্যবেক্ষণে ঘাটতি রয়েছে মুদ্রাবাজারে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ঠিক রাখতে ঝুঁকি বণ্টন-পদ্ধতি বা হেজিং নিয়ে ভাবতে হবে ব্যাংকগুলোকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৮৮৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি ডলার। ফলে গেল অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে গেল অর্থবছরের পুরো সময় রফতানি বাবদ বাংলাদেশ আয় করেছে ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। সে হিসাবে গেল অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে এলসি খোলা হয়েছে ৬ হাজার ৯৪২ কোটি ২১ লাখ ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৮১২ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ফলে এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে এ সময়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ হাজার ১৫৩ কোটি ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৪২৭ কোটি ২৭ লাখ ডলার। ফলে এলসি খোলায় নিষ্পত্তি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে খাদ্যপণ্যের মধ্যে চাল ও গমের আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৩৬০ কোটি ৯১ লাখ ডলারের; যা আগের অর্থবছরে ছিল মাত্র ১৪৭ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে খাদ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলার হার বেড়েছে ১৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এ সময়ে খাদ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি বেড়েছে ১৬১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ এ পণ্যগুলোর এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৩০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ১১৪ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।

এদিকে আমদানি লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় চাপের মুখে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। বাজার স্বাভাবিক রাখতে ডলার বিক্রি করেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল গত মার্চ-এপ্রিল মেয়াদে ১৪০ কোটি ডলারে উঠেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদে আকুর বিল ১৫৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে উঠেছিল।

শেয়ার করুন ..