ট্রাম্প-কিমে আটকা পড়েছেন মুন

342

উত্তর কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক যখন মারাত্মক আকার ধারণ করে তখনই দুই দেশের নেতাদের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। চিরবৈরী দুই দেশের নেতাদের এক টেবিলে আনতে যিনি মধ্যস্ততা করেছেন তিনি হলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জা ইন। উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

দুই দেশের মধ্যে এ আলোচনা ধরে রাখতে এবং কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি বজায় রাখতে তৃতীয়বারের মতো উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করছেন মুন জা ইন। বৈঠক উপলক্ষে বর্তমানে পিয়ংইয়ং অবস্থান করছেন তিনি।

অন্য দু’বারের তুলনায় বর্তমান বৈঠকটি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। পরমাণু অস্ত্র পরিত্যাগ করার জন্য উত্তর কোরিয়াকে বোঝানোর বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে আলোচনায় অগ্রগতি করতে হবে। সেটি না হলে দুই কোরিয়ার বৈঠক, ট্রাম্প এবং কিমের সাক্ষাৎ- সবকিছুই শুধু ফটোসেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হলে উত্তর কোরিয়ার সাথে আলোচনায় অগ্রগতি করতেই হবে। অগ্রগতির ক্ষেত্রে আসল প্রতিবন্ধকতা কোথায়? তার কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো।

উত্তর কোরিয়াকে আরো বোঝাতে হবে

গত জুন মাসে উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে সিঙ্গাপুরে বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে এখন আর পরমাণু হামলার আশংকা নেই। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, উত্তর কোরিয়া তাদের পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে আসবে না।

উত্তর কোরিয়া এতো বছর ধরে তাদের পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে। এখন তারা সেখান থেকে সরে আসবে কেন? এছাড়া উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট এখন পর্যন্ত যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটি খুবই অস্পষ্ট।

গ্রিফিত এশিয়া ইনস্টিটিউটের আন্দ্রে আব্রাহামিয়ান বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, উত্তর কোরিয়াকে এ সপ্তাহে কিছু প্রতীকী কিংবা উল্লেখযোগ্য ছাড় দিতে হবে যাতে দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের আগ্রহ বজায় থাকে’।

তিনি বলেন, ‘মুন যদি আলোচনায় অগ্রগতি করতে পারে তাহলে দেশের ভেতরে তার অবস্থান শক্ত হবে এবং আমেরিকার ওপর চাপ বজায় রাখতে পারবে যাতে তারা সামনে এগিয়ে যায়’।

উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে চলতি মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চপর্যায়ের নেতারা বৈঠক করেছিলেন। তাদের কাছে কিম আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে পরমাণু কর্মসূচি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ট্রাম্পকে আলোচনায় ধরে রাখা

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া তাদের সর্বশেষ মিসাইল পরীক্ষা করেছিল ১০ মাস আগে। এটা এক ধরনের অগ্রগতি। কিন্তু স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে উত্তর কোরিয়া তাদের অস্ত্র মজুদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

জনসম্মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরীয় নেতার প্রশংসা করেছেন। ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়ার সামরিক মহড়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শনী না করায় কিমকে ধন্যবাদ জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তবে জনসম্মুখে যাই বলুক না কেন, পরমাণু অস্ত্র বন্ধের বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন ট্রাম্প প্রশাসন।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রধান কাজ হচ্ছে, ট্রাম্প এবং কিমকে আলোচনার টেবিলে আবার বসানোর জন্য আগ্রহ ধরে রাখা।

উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন। সেখানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দেখা করবেন।

আলোচনা যেখানে শুরু হয়েছিল, সেখানে কাজ করা

পিয়ংইয়ং এবং ওয়াশিংটন পরস্পরের সাথে ভিন্ন-ভিন্ন অবস্থান থেকে আলোচনা করছে। সেজন্য আলোচনা আটকে গেছে।

উত্তর কোরিয়া চায় কোরিয়া যুদ্ধ শেষ করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। দক্ষিণ কোরিয়াও সেটাই চায়। ১৯৫৩ সালে যুদ্ধ শেষ হলেও কোনো শান্তি চুক্তি হয়নি। এপ্রিল মাসে এক বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুদ্ধ শেষ করার জন্য আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার-নামা স্বাক্ষর করেছে।

কিন্তু সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল না। ওয়াশিংটন চায় কোনো শান্তি চুক্তি করার আগে উত্তর কোরিয়া পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করুক।

ব্যক্তিগত বোঝা বয়ে চলা

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জা ইন এর পিতা-মাতা কোরিয়া যুদ্ধ চলার সময় উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে এসেছেন। সে সময় প্রায় এক লাখ মানুষ পালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় এসেছিল। শরণার্থী ক্যাম্পে জন্ম হয়েছিল মুনের।

মুন এর পিতা-মাতা চান মৃত্যুর পর তাদের জন্মভূমি উত্তর কোরিয়ার মাটিতে তাদের দাফন করা হোক। বাবা-মায়ের এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার গুরু দায়িত্ব রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কাঁধে।

এক সময় তারা ভাবতেন যে কমিউনিস্ট উত্তর কোরিয়ার সাথে কথা বলা উচিত হবে না কিংবা তাদের সাথে কথা বলা যায় না। কিন্তু এখন উত্তর কোরিয়া ধীরে-ধীরে পাল্টাচ্ছে বলে মনে করেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বাবা। কিন্তু উত্তর কোরিয়া সত্যিকার অর্থে বদলাবে কি না সেটি নিয়ে তার মনে দ্বিধা রয়েছে।

শেয়ার করুন ..