মুমিন বিপদে পড়লে করণীয় কি ?

194

গোটা দুনিয়ার জীবনটায় মুমিনদের জন্য পরিক্ষাগার। এখানে প্রতিটি পদে পদে আল্লাহ মুমিনদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এ পরিক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ প্রমান করতে চান একজন মুমিন তার ঈমানের দাবিতে কতটুকু সত্যবাদি বা মিথ্যাবাদি। ঈমানদার বলে দাবীদার ব্যক্তিটি বিপদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে তার পথে টিকে থাকবে না ছিটকে পড়বে এটায় আল্লাহ দেখতে চান।
এ সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ ইরশাদ করছেন, মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ইমান এনেছি বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, অথচ তাদের পরীক্ষা করা হবে না? বরং অবশ্যই তাদের পরীক্ষা করবো যেভাবে আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছিলাম। এর ফলে অবশ্যই আল্লাহ জেনে নেবেন, কারা তার দাবীতে সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী। সূরা আনকাবুত : ২-৩
আল্লাহ মুমিনদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন বিভিন্নভাবে। কখনো বিপদাপদ দিয়ে, কখনো জালিমের অত্যাচারের মাধ্যমে, কখনো সম্পদের হানি করে, কখনো রোগ-শোকের মাধ্যমে, কখনো অভাব দিয়ে, কখনো বা অধিক সম্পদ দিয়ে পরিক্ষা নিয়ে থাকেন। যেমন আল্লাহ বলেন-
ۗ الصَّابِرِينَ وَبَشِّرِ -وَالثَّمَرَاتِ وَالْأَنفُسِ الْأَمْوَالِ مِّنَ وَنَقْصٍ وَالْجُوعِ الْخَوْفِ مِّنَ بِشَيْءٍ وَلَنَبْلُوَنَّكُم
আর নিশ্চয়ই আমরা ভীতি, অনাহার, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে এবং উপার্জন ও আমদানী হ্রাস করে তোমাদের পরীক্ষা করবো ৷(হে নবী) এ অবস্থায় যারা সবর করে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও। সূরা বাকারা-১৫৪
আল্লাহ মুমিন বান্দাদের যতপ্রকার পরীক্ষা নিয়ে থাকেন তার মধ্যে অন্যতম হলো বিপদাপদ দিয়ে। এজন্য বিপদে পড়লে মুমিনদের সতর্কতার সাথে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে পরিস্থিতি মুকাবেলা করা উচিৎ। আর এটা যারা করতে পারে তাদের জন্যই আল্লাহ বলছেন- الصَّابِرِينَ وَبَشِّرِ -এ অবস্থায় যারা সবর করে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও। এবস্থায় আল্লাহর প্রশংসাসহ তার ইবাদতে আরো বেশি মনযোগী হতে হবে এবং তার সাজদানবত হতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ ইরশাদ করছেন-
الْيَقِينُ يَأْتِيَكَ حَتَّىٰرَبَّكَ وَاعْبُدْ ﴾﴿ السَّاجِدِينَ مِّنَ وَكُن رَبِّكَ بِحَمْدِ فَسَبِّحْ يَقُولُونَ بِمَا صَدْرُكَ يَضِيقُ أَنَّكَ نَعْلَمُ وَلَقَدْ ﴾﴿
হে নবী আমি জানি, এরা ( ইসলাম বিদ্বেষীরা) তোমার সম্বন্ধে যেসব কথা বানিয়ে বলে তাতে তুমি মনে ভীষণ কষ্ট পাও৷ এর প্রতিকার এই যে, তুমি নিজের রবের প্রশংসা সহকারে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করতে থাকো, তাঁর সকাশে সিজ্দাবনত হও। সূরা হিজর ৯৭-৯৯
মুসিবত পুন্যবান হয়ার আলামত। মুসিবত নিজেকে সংশোধন করে নতুন করে আবার তৈরী করার সুযোগ করে দেই তাই বিপদে পরলে আল্লাহ্র প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে তার ইবাদাত চালিয়ে যাওয়া এবং তার উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করা। কেননা বিপদ যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে তেমনি তিনিই এ বিপদ থেকে মানুষদের উদ্ধার করেন। বিপদের সময় আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য কিছু দোয়াও পাঠ করা যেতে পারে। যেমন কোন মহানবী (সা.) বিপদের সম্মুখিন হলে প্রায় কিছু দোয়া পাঠ করতেন এবং সেই দোয়াগুলো উম্মতদেরও পাঠ করতে বলেছেন।
দোয়া গুলি হলো-
১। সাদ ইবনে আবি ওক্কাস রা. বলেন, নবীজি সা. দুঃখ-কষ্টের সময় বলতেন :
الظَّالِمِينَ مِنَ كُنْتُ إِنِّي سُبْحَانَكَ أَنْتَ إِلَّا إِلَهَ لَا বাংলা উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতুম মিনাজ জলিমিন। বাংলা অর্থ : একমাত্র তুমি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। নিশ্চয়ই আমি সীমালঙ্ঘনকারী। [সুরা আম্বিয়া-৮৭] (তিরমিজি : ৩৫০০)
২। আসমা বিনতে ওমাইর রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেন, আমি কি তোমাদের এমন কিছু দোয়া শিখিয়ে দেব না যা তুমি দুশ্চিন্তাা ও পেরেশানির মধ্যে পড়বে। সাহাবী (রাঃ) রা বললেন, অবশ্যই শেখাবেন। নবীজি বললেন, দোয়াটি হচ্ছে : ‘আল্লাহু আল্লাহ রব্বী লা উশরিকু বিহি শাইয়ান।’
অর্থ : আল্লাহই আল্লাহ আমার প্রতিপালক। আমি তার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করি না। (আবু দাউদ : ১৫২৫)
৩। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেন :আল্লাহুম্মা লা সাহলা ইল্লা মা জায়ালতাহু সাহলান, ওআনতা তাজআলুল হুযনা সাহলান ইযা শিইতা।
অর্থ : ইয়া আল্লাহ, কোনো বিষয় সহজ নয়। হ্যাঁ, যাকে তুমি সহজ করে দাও। যখন তুমি চাও তখন আমার মুশকিলকে সহজ করে দাও। (ইবনে হিব্বান : ৯৭৪)
৪.হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বিপদের সময় এই দোয়াটি পাঠ করতেন-দোয়া: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আলিমুল হাকিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুল আরশিল আজিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি- ওয়া রাব্বুল আরশিল কারিম।
অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তিনি পরম সহিষ্ণু ও মহাজ্ঞানী। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তিনি মহান আরশের প্রভু। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্যনেই, তিনি আকাশমন্ডলী, জমিন ও মহাসম্মানিত আরশের প্রভু। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
বিপদের পড়লে করনীয় কাজঃ
১. যে কোন পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকাঃ একজন মুমিন ভাল কিংবা খারাপ সকল কিছুকেই হাসি-খুশিতে মেনে নেই ঠিক একজন পথিকের ন্যায়। একজন পথিক মনে করে যে, সে খুব অল্প সময় এখানে অবস্থান করবে তাই সবকিছু মেনে নেয়। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পার্থিব জীবনের উদাহরণ টেনে বলেন, “পার্থিব জীবন ঐ পথিকের ন্যায়, যে গ্রীষ্মে রৌদ্রজ্জ্বল তাপদগ্ধ দিনে যাত্রা আরম্ভ করল, অতঃপর দিনের ক্লান্তময় কিছু সময় একটি গাছের নীচে বিশ্রাম নিল, ক্ষণিক পরেই তা ত্যাগ করে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করল।” হে মুসলিম! দুনিয়ার সচ্ছলতার দ্বারা ধোঁকা খেওনা, মনে করো না, দুনিয়া স্বীয় অবস্থায় আবহমানকাল বিদ্যমান থাকবে কিংবা পট পরিবর্তন বা উত্থান-পতন থেকে নিরাপদ রবে। অবশ্য যে দুনিয়াকে চিনেছে, এর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছে, তার নিকট দুনিয়ার সচ্ছলতা অতি মূল্যহীন।
২. তাকদিরের উপর পূর্ণ ঈমান রাখা : একজন মুমিন সে তার ত্বকদীরকে পুরোপুরি মেনে নেয় এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখে। চির সত্যবাদী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন – জেনে রেখ, সমস্থ মানুষ জড়ো হয়ে যদি তোমার উপকার করতে চায়, কোনও উপকার করতে পারবে না, তবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আবার তারা সকলে মিলে যদি তোমার ক্ষতি করতে চায়, কোনও ক্ষতি করতে পারবে না, তবে যততুটু আল্লাহ তোমার কপালে লিখে রেখেছেন।
৩. বিপদের সময় রাসূল (সঃ) এবং তার আদর্শ পূর্বসূরীদের জীবন চরিত পর্যালোচনা করা : বিপদেও সময় রাসূল (সঃ) এবং তার সাথীরা কিভাবে তার মুকাবেলা করেছেন তা পর্যালোচনা করা কেনানা তাদের মধ্যেই উত্তম আদর্শ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।”
৪. আল্লাহর রহমতের প্রসস্ততা ও করুণার ব্যাপকতার স্মরণ : হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমার ব্যাপারে আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী, আমি ব্যবহার করি।” মুসিবত দৃশ্যত অসহ্য-কষ্টদায়ক হলেও পশ্চাতে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। তাই বান্দার কর্তব্য আল্লাহর সুপ্রসস্থরহমতের উপর আস্থাবান থাকা।
৫. বিপদের সময় অধিকতর বিপদগ্রস্থ ব্যক্তিদের দিকে নজর দেওয়া : রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ধৈর্য অসম্ভব বা অসাধ্য কিছু নয়, যে র্ধৈয্যধারণ করে আল্লাহ তাকে ধৈর্য্যধারণের ক্ষমতা দান করেন।” বিকলাঙ্গ বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি, তার চেয়ে কঠিন বিপদগ্রস্থকে দেখবে। একজনের বিরহ বেদানায় ব্যথিত ব্যক্তি, দুই বা ততোধিক বিরহে ব্যথিত ব্যক্তিকে দেখবে। এক সন্তানহারা ব্যক্তি, অধিক সন্তানহারা ব্যক্তিকে দেখবে। সব সন্তানহারা ব্যক্তি, পরিবারহারা ব্যক্তিকে দেখবে, তাহলে এর মধ্যে সান্তনা খুজে পাবে।
৬. মনে করতে হবে মুসিবত পুণ্যবাণ হওয়ার আলামত :একদা সাহাবী সাদ বিন ওয়াক্কাস রা. রসূল সা.কে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রসূল, দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্থ কে? উত্তরে তিনি বলেন, “নবীগণ, অতঃপর যারা তাদের সাথে কাজ-কর্ম-বিশ্বাসে সামঞ্জস্যতা রাখে, অতঃপর যারা তাদের অনুসারীদের সাথে সামঞ্জস্যতা রাখে। মনে রাখবে মানুষকে তার দ্বীন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। দ্বীনি অবস্থান পাকাপোক্ত হলে পরীক্ষাও কঠিন হয় আর দ্বীনি অবস্থান দুর্বল হলে পরীক্ষাও শিথিল হয়। মুসিবত মুমিন ব্যক্তিকে পাপশূন্য করে দেয়, এক সময়ে দুনিয়াতে সে নিষ্পাপ হয়ে বিচরণ করতে থাকে।”
এভাবেই একজন মুমিন তার গোটা জিন্দিগীটা পরিচালনা করে, সকল দুঃখ কষ্ট আনন্দচিত্বে গ্রহন করে নেয় তবুও আল্লাহর পথ থেকে এক বিন্দু পরিমান টলে না, দুঃখ কষ্টের কাছে হার মানে না।
আল্লাহ আমাদের সকল বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে তার পথে অবিচল থাকার তৈফিক দান করুন। আমিন।

লেখকঃ ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর

শেয়ার করুন ..