গ্রেনেড হামলা মামলার রায় আজ

251

দীর্ঘ ১৪ বছর অপেক্ষার পর আজ বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো বর্বর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত দুই মামলার রায় ঘোষিত হতে যাচ্ছে। পুুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন এজলাসে ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. শাহেদ নুর উদ্দিন এ রায় ঘোষণা করবেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে জঘন্য গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। সে সময়ে বিরোধী দলের নেত্রী, আওয়ালীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই মূলত এ হামলা চালানো হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে যান। কিন্তু ওই হামলায় প্রাণ হারান তৎকালীন মহিলা আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন। আহত হন শতাধিক নেতাকর্মী। এ ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক ফারুক হোসেন দণ্ডবিধির ১২০/বি, ৩২৪, ৩২৬, ৩০৭, ৩০২, ২০১, ১১৮, ১১৯, ২১২, ৩৩০, ২১৮, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় বাদী হয়ে একটি মামলা (নং-৯৭) করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় পৃথক দুটি এজাহার দায়ের করেন।

এরপর প্রথমে মতিঝিল থানা পুলিশ ও পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। ডিবি পুলিশের তদন্ত শেষের আগেই সিআইডিকে দায়িত্ব দেয়া হয়। একে একে সিআইডির সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তদন্ত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে সিআইডি কর্মকর্তারা নোয়াখালীর সেনবাগের জজ মিয়া নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে গ্রেনেড হামলার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেন।

২০০৭ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার নতুন তদন্ত শুরু হয়। ওই সময় মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির এএসপি ফজলুল কবির। তিনি ২০০৮ সালের ৯ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে ঢাকার সিএমএম আদালতে দুটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। সে বছরই মামলা দুটির কার্যক্রম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ স্থানান্তর করা হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে মামলা দুটির অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়। আদালতের অনুমতিক্রমে শুরু হয় নতুন তদন্ত। সিআইডির তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ দীর্ঘ তদন্ত শেষে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ আরো ৩০ জনকে অভিযুক্ত করে ২০১১ সালের ২ জুলাই আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন। এই তদন্তে ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) পাশাপাশি হাওয়া ভবনের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অভিযোগে সম্পূরক অভিযোগপত্রে প্রথম তিন তদন্ত কর্মকর্তাকেও অন্তর্ভুক্ত করেন আবদুল কাহার আকন্দ।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরসহ ৩০ জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করায় আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২। এর মধ্যে জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও তার সহযোগী শরীফ শাহেদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেয়া হয়। মামলার বর্তমান আসামি সংখ্যা ৪৯। এর মধ্যে পলাতক ১৮ জন। কারাগারে আছেন ২৩ জন। জামিনে ছিলেন আটজন। রায়ের তারিখ ঘোষণার দিন তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়।

২০১২ সালের ১৮ মার্চ সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে ফের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন বিচারক। মোট ২২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এসব সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। পরে আসামিপক্ষ ৯০ কার্যদিবস ও রাষ্ট্রপক্ষ ২৯ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ও শুনানি করে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিচারক রায় ঘোষণার দিন ঠিক করেন।

মামলার আসামিদের মধ্যে কারাগারে আছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলুবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদত উল্যাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহমেদ তামিম, মইনুদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান সুমন, মো. রফিকুল ইসলাম সবুজ, মো. উজ্জল ওরফে রতন, হরকাতুল জিহাদ নেতা আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মাদ ওরফে জিএম, শেখ আব্দুস সালাম, কাশ্মীরি নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাট, আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা শাওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম ও রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী।

পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক এমপি শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুনছালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, লিটন ওরফে মাও. লিটন, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক উপকমিশনার মো. ওবায়দুর রহমান, পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাইদ হাসান, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার ও মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন আহমেদ, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, শফিকুর রহমান, আব্দুল হাই ও বাবু ওরফে রাতুল বাবু। তাদের গ্রেফতারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছে।

পলাতক আসামীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থান জানতে পেরেছে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা। এদের মধ্যে মাওলানা তাজউদ্দীন ও তাঁর ভাই রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে, সাবেক এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ সৌদি আরবে, সাবেক মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন ও লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার দুবাইতে, দুভাই— হরকাতুল জিহাদ নেতা মহিবুল মত্তাকিন ও আনিসুল মোরছালিন রয়েছে ভারতের তিহার জেলে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক বিশেষ সহকারী হারিছ চৌধুরী মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত-এই পাঁচ দেশে ঘুরেফিরে থাকছেন।

এসব আসামীকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করার পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে সরকার।

শেয়ার করুন ..