সাফল্যের রঙে রাঙানো হলো না বছরের শেষটা

181

না হলো না, সাফল্যের রঙে বছরের শেষটা আর রাঙাতে পারলেন না সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা। একটি জয়েই ২০১৮ সাল হয়ে থাকতে পারতো টাইগারদের সোনালি সাফল্যে মোড়া একটি বছর। কিন্তু সে কাঙ্ক্ষিত জয় আর ধরা দিল না। উল্টো ৫০ রানের পরাজয়ে শেষ হলো বছর।

জয়-পরাজয়, সাফল্য-ব্যর্থতা ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিল ‘আম্পায়ারিং’। ম্যাচের ফল ও বাংলাদেশেরে ‘ট্রিপল ক্রাউন’ জিততে না পারার চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিল আম্পায়ার তানভিরের ন্যাক্কারজনক খেলা পরিচালনা। পরপর দুইবার ভুল কল দিয়ে ‘ভিলেন’ বনে গেছেন আম্পায়ার তানভির আহমেদ।

বাংলাদেশ ইনিংসের চতুর্থ ওভারের শেষ বলে ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলার ওশেন থমাসের বলে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে বসেন লিটন দাস। ফিল্ডার বল হাতে নিয়ে উল্লাসে ফেটে ওঠার সাথে সাথে আম্পায়ার তানভির মুখে ‘নো’ বলে আর ডান হাত প্রসারিত করে জানিয়ে দেন, নাহ আউট হবে না। এটা নো বল।

আম্পায়ার তানভিরের ভাষ্যমতে বোলার ওশেন থমাসের সামনের পা ডেলিভারির সময় পপিং ক্রিজের বাইরে গিয়েছিল বা ডেলিভারির আগে থমাসের সামনের পা পপিং ক্রিজ অতিক্রম করেছিল। কিন্তু টিভি রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা গেল, বোলার থমাসের সামনের পা মোটেই দাগ অতিক্রম করেনি। দাগের মধ্যেই ছিল। তা নিয়ম অনুযায়ী মোটেই ‘নো’ বল নয়। একদম সিদ্ধ ডেলিভারি।

সে ‘নো’ বল ডাকা নিয়ে রাজ্যের তুলকালাম! প্রসঙ্গত, ঠিক তার আগেও একবার থমাসের সামনের পা পপিং ক্রিজের বাইরে না থাকার পরও তানভির ‘নো’ ডেকেছিলেন। দ্বিতীয় বার একই ভুল করায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটাররা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এক সময় অধিনায়ক মাঠের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ক্রিকেটারদের ডেকে পিচের পাশেই একটা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে বসেন।

তাদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিলো আম্পায়ারের ভুল ‘নো’ বল ডাকার প্রতিবাদে বুঝি মাঠ ছাড়বে ক্যারিবীয়রা। এভাবেই চলতে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। এক পর্যায়ে মাঠের ঠিক বাইরে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের সামনে বসে থাকা চতুর্থ আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা সৈকতের কাছে গিয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন ক্যারিবীয় অধিনায়ক ব্রাথওয়েট।

আম্পায়ারের ডাকা ‘নো’ বলের সিদ্ধান্ত যে ঠিক ছিল না, তা বারবার বলতে থাকেন উইন্ডিজ ক্যাপ্টেন। টিভির পর্দায় তার শরীরী অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল, ব্রাথওয়েট ফোর্থ আম্পায়ারকে বলছিলেন, এমন ভুল সিদ্ধান্ত দিলে খেলবো কি করে?

এমন সময় থার্ড আম্পায়ার গাজী সোহেল নেমে আসেন। এক পর্যায়ে ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো‘ও গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের তিন তলায় তার নিজের নির্দিষ্ট কক্ষ থেকে নেমে মাঠের ঠিক বাইরে ব্রাথওয়েটের কাছে চলে আসেন। তার সাথে কথা বার্তা বলার পর ক্ষান্ত হন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক। পরে আট মিনিট বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয় খেলা।

কিন্তু শুরু হলে হবে কি? ততক্ষণে একটা বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে। আম্পায়ারের এ কাণ্ডের সময় বাংলাদেশের স্কোর ছিলো ৫৬ রান (৩.৫ ওভারে ১ উইকেটে)। আম্পায়ার তানভিরের ‘নো’ বল কাণ্ডে একদম সাজানো বাগান তছনছ।

ক্যারিবীয় স্পিনার ফাবিয়ান অ্যালেনের পরপর দুই বলে লংঅনের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে আউট সৌম্য ও অধিনায়ক সাকিব। মূলতঃ ওই ওভারেই বাংলাদেশের ভিত ভেঙে যায়। এরপর মাত্র ১৮ বলের ব্যবধানে মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর বিদায়ে ম্যাচ থেকেই ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

শেষমেশ মেহেদি মিরাজ ও আবু হায়দার রনিদের দৃঢ়তায় কমেছে স্রেফ পরাজয়ের ব্যবধানটাই। ৫০ রানের বড় ব্যবধানের পরাজয়েই শেষ হয় টাইগারদের বছর।

অথচ বছরটা শুরু হয়েছিল শেরে বাংলায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে ৮ উইকেটের দারুণ এক জয় দিয়ে। সেটা ছিল দেশের মাটিতে তিন জাতি আসর। বাঁ-হাতি ওপেনার তামিম ইকবাল ৯৩ বলে ৮৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেললেও বল ও ব্যাট হাতে দারুণ পারফরমেন্সে ম্যাচ সেরার পুরস্কার উঠেছিল সাকিব আল হাসানের হাতে। ৪৩ রানে তিন উইকেট ও ৪৬ বলে ৩৭ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন সাকিব।

১৫ জানুয়ারি প্রথম ম্যাচটি অনায়াসে জেতার মাত্র ৭২ ঘণ্টা পর আবারও সাকিব ‘ম্যাজিক’। ব্যাট ও বলে সমানভাবে জ্বলে উঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রেকর্ড ১৬৩ রানের বিরাট জয়ের রূপকার হন সাকিব। তিন নম্বরে খেলতে নেমে ৬৩ বলে ৬৭ আর ৪৭ রানে ৩ উইকেট দখল করে লঙ্কা বধের নায়ক বনে যান বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার।

আজ ২২ ডিসেম্বর বছরের শেষ ক্ষণে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলেছে টিম বাংলাদেশ। যদিও ফরম্যাট ভিন্ন; টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। তারপরও টেস্ট, ওয়ানডে আর এই ফরম্যাটে ২০১৮ সালে এটাই শেষ ম্যাচ বাংলাদেশের।

বছরের শুরুতে ঘরের মাঠে তিন জাতি ওয়ানডে আসরে শিরোপা জেতা সম্ভব না হলেও শুরু হয়েছিল উদ্ভাসিত জয় দিয়ে। আজ শেষ ম্যাচ জিতলে ‘ট্রিপল ক্রাউন’ অর্জনে হয়ত সে না পারার দুঃখ ঘুচতো। অতৃপ্তির বদলে এক বড় অর্জন প্রাপ্তি যোগ হতো। যা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসকেই করতো আরও বেশি সমৃদ্ধ।

ইতিহাস জানাচ্ছে, এর আগে কখনও বাংলাদেশ তিন ফরম্যাটে সিরিজ জিততে পারেনি। তবে সম্ভাবনা ছিল ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। সেবার টেস্টে (৯৫ রান ও ৪ উইকেটে) ২-০ আর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ক্যারিবীয়দের হোয়াইটওয়াশ (৫২ রান, ৩ উইকেট ও ৩ উইকেটে জিতেছিল টাইগাররা) করলেও এক ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ম্যাচ আর জিততে পারেনি সাকিবের দল। হেরেছিল ৫ উইকেটে।

এরপর ২০১৫ সালে পাকিস্তানের সাথেও ট্রিপল ক্রাউন জেতার সুযোগ ছিল। সেবার তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানিদের ‘বাংলাওয়াশ’ করার পর একমাত্র ওয়ানডেতেও জিতেছিল টাইগাররা; কিন্তু টেস্টে পারেনি। খুলনায় তামিম ইকবালের দারুণ ডাবল সেঞ্চুরি (২০৬) আর ইমরুল কায়েসের ১৫০ রানের দারুণ ইনিংস ও প্রথম উইকেটে ৩১২ রানের রেকর্ড জুটিতে কৃতিত্বপূর্ণ ড্র করলেও ঢাকায় হেরে গিয়েছিল ৩২৮ রানের বড় ব্যবধানে। আর তাতেই ট্রিপল ক্রাউন জেতার এক সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল।

তিন বছর পর আবার এসেছিল সেই তিন ফরম্যাটে সিরিজ বিজয়ের সুবর্ণ সুযোগ। আজ জিততে পারলে সাফল্যের নতুন ইতিহাস রচিত হতো বাংলাদেশ ক্রিকেটে।

এমনিতেই তিনি বাংলাদেশ দলের প্রাণশক্তি। সেই অভিষেকের পর যত দিন গড়াচ্ছে, ততই দলের সাফল্যের কান্ডারি সাকিব। তারপরও এ বছর ব্যাট ও বল হাতে একদম বছরের প্রথম থেকেই দলের সাফল্যে রাখছেন অগ্রণী ভূমিকা। সেই সাকিবের নেতৃত্বেই সুযোগ ছিলো এ ট্রিপল ক্রাউন অর্জন করার।

কিন্তু বছরের শেষ ম্যাচটিতে বল হাতে দুর্দান্ত থাকলেও ব্যাট হাতে প্রথম বলেই সাজঘরে ফেরেন টাইগার অধিনায়ক। আর তার উইকেটের পর থেকেই আস্তে আস্তে ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়া এবং শেষতক ৫০ রানের পরাজয়ে বছরটা শেষ করা।

শেয়ার করুন ..