৩০ ডিসেম্বর ভোট বিপ্লব করুন : ড. কামাল

265

৩০ ডিসেম্বর ভোট বিপ্লব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে সবাইকে ভোটে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ বলছে পরিবর্তন চাই। মানুষ ভালো থাকলে এটা বলত না। তারা পরিবর্তন চায়, ভোটের মাধ্যমে চায়, শান্তিপূর্ণভাবে চায়। আমাদের হলো ভোটের বিপ্লব। একাত্তরে তো ভালোভাবে করে দেখিয়েছি, তারপরে কয়েকবার দেখিয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোটের বিপ্লব করবেন আপনারা সবাই। আমরা সবাই মিলে ভোটের বিপ্লব করব এবং ১৬ ডিসেম্বর যেমন আমরা বিজয় অর্জন করেছি, ৩০ ডিসেম্বর আমরা সেইভাবে বিজয় অর্জন করব—জনগণের বিজয়, আমাদের সবার বিজয়। এই কয়েকটা দল যারা আমরা ঐক্যফ্রন্ট করেছি, এটা আমাদের বিজয় নয়, এটা হবে সবার বিজয়।’

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কার্যালয়ে জোটের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল এই আহ্বান জানান।

ড. কামাল বলেন, ‘ধানের শীষে ভোট দিলে আপনারা মুক্ত হবেন। এই প্রতীক কোনো দলের প্রতীক নয়, এটা ঐক্যের প্রতীক। জনগণের ঐক্যের প্রতীক। ঐক্যবদ্ধ জনগণের পক্ষে ভোট দেবেন, ধানের শীষে ভোট দেবেন। ইনশাআল্লাহ জনগণ বিজয়ী হবে, আপনারা বিজয়ী হবেন। আমি সেই বিজয়ের ভাব সারা দেশে পাচ্ছি। সারা দেশ থেকে আমরা প্রতিদিন খবর পাচ্ছি, তাঁরা বলছেন আমাদের এখানে যে আনন্দ-উল্লাস। মানুষ বিশ্বাস করছে যে হয়েই গেছে। দুই দিন অপেক্ষা মাত্র।’ তিনি বলেন, ‘সারা দেশে জনগণের অসাধারণ সাড়া। বলতে পারেন মানুষ কিভাবে আনন্দ-উল্লাসে আমাদের দেখতে ছুটে এসেছে। নেতারা ঘরে ঘরে যান, গ্রামে গ্রামে যান আর দেখেন। অনেকে বলছেন ভয়-ভীতির কথা। আমি কোনো মানুষের মধ্যে কোনো ভয়-ভীতি দেখিনি। আমরা স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছি। জয়ী আমরা হয়েছি। স্বৈরাচার বিজয়ী হলে একাত্তর হতো না, বাংলাদেশ হতো না। অতীতে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। কাদের সিদ্দিকী আমার পাশে বসা। বিজয়ী যোদ্ধা। তারা দেখেছে, বাংলার মানুষ কোনো শক্তির কাছে, অস্ত্রের কাছে, অর্থের কাছে মাথানত করে নাই, পরাজিত হয় নাই—এই বিশ্বাসটা রেখে আপনারা মাঠে থাকুন।’

ভোটারদের উদ্দেশে ঐক্যফ্রন্ট নেতা বলেন, ‘আপনারা শক্তভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকুন। লাইনে দাঁড়িয়ে সকালে সকালে গিয়ে ভোট দিতে হবে। গণনার সময়ে এজেন্ট ও প্রার্থীকে উপস্থিত থাকতে হবে। গণনার ফলাফল সেটা স্বাক্ষর করে নিয়ে আসবেন। ইনশাআল্লাহ নিশ্চয়ই আমরা বিজয়ী হব। ভোট বিপ্লব হবে।’

নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দুই ভাগে বিশ্লেষণ করে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘একদিকে হলো দেশের ১৬ কোটি মানুষ আর আরেক দিকে যারা অহংকারের সুরে কথা বলে এবং এই ধারণা করে তারা দেশের মালিক। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, দেশের মালিক তারা নয়, দেশের মালিক ১৬ কোটি জনগণ। আমরা ১৬ কোটি মানুষের পক্ষে বলি, আপনারা ভোট দেন। ১৬ কোটি মানুষ দেশের মালিক হলে সবাই মাথা উঁচু করে থাকবে।’

ধানের শীষ প্রতীকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি এই মার্কা নিয়ে। অবশ্যই এই মার্কায় আপনারা ভোট দেবেন। আজকে স্বাধীনতার ৫০ বছর সামনে রেখে আমরা সেই বাংলাদেশ গড়তে চাই তিন বছরে যেখানে আমরা সবাই মিলে আনন্দ করতে পারব। সেখানে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।’

শিক্ষার মান অনেক নেমে গেছে বলেও সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, ‘আমি ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম। এখন যাঁরা ছাত্র আছেন আপনাদের আত্মীয়-বন্ধুদের মধ্যে তাঁদের জিজ্ঞাসা করুন শিক্ষার মান কোথায় আছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমি যেভাবে পেয়েছিলাম, এখন তার চেয়ে অনেক অনেক মান নেমে আছে। স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা দেখুন মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে। রাজধানীতে হাসপাতালগুলোতে ওষুধপত্র বাইরে থেকে আনতে হয়। এগুলো কি স্বাধীন দেশে ৪৭ বছর পর হওয়ার কথা?’

জনপ্রশাসনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘প্রশাসনকে আমরা চেয়েছি স্বাধীন দেশের প্রশাসন হিসেবে। জনস্বার্থে আপনারা কাজ করবেন, কোনো দলের স্বার্থে না। এটা আমি জোর গলায় বলতে পারি, আমরা যুক্তফ্রন্ট সরকারে এদের (প্রশাসন) কাউকে বলব না কারো পক্ষে কাজ করো। আমরা দলীয়করণের বিপক্ষে। আমরা দলীয়করণ থেকে মুক্ত করার জন্য সরকারে যেতে চাচ্ছি। রাষ্ট্র ও সরকারি কর্মচারী যারা আছে, সবাইকে বলছি আপনারা দলীয়করণের শিকার হবেন না।’

এ সময় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা যেসব কার্যকলাপ বা ভূমিকা পালন করছেন, তার জন্য সিইসির তালিকায় নয়, মীর জাফরের তালিকায় তাঁর নাম থাকবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সরকারের এরই মধ্যে নৈতিক পরাজয় হয়েছে। আওয়ামী লীগকে প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে।’ পাপের কাছে নতি শিকার না করে, ৩০ ডিসেম্বর জনগণকে তাদের মুক্তির জন্য, নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় গণমাধ্যমকে কারো কাছে নতি স্বীকার না করে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনেরও আহ্বান জানান ফখরুল।

তিনি বলেন, এই সরকারের মোরাল ডিফিট (নৈতিক পরাজয়) হয়েছে। কারণ তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে। মানে তাদের নিজেদেও কোনো জনভিত্তি নেই। আওয়ার ভিক্টরি অলরেডি অ্যাচিভ। ভোট ডাকাতি হলে জনগণ নিশ্চয়ই বসে থাকবে না। নিশ্চয়ই তারা ওই সময়ে করণীয় জানিয়ে দেবে।

বৈঠক শেষে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে থাকছি। শেষ পর্যন্ত থাকতে চাই এবং শেষ দেখতে চাই।’

বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, প্রেসিডিয়াম সদস্য জগলুল হায়দার আফ্রিক, নাগরিক ঐক্যের প্রেসিডিয়াম সদস্য শহীদুল্লাহ কায়সার, মোমিনুল ইসলাম, জাহেদ উর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে সারা দেশে নির্বাচনী সহিংসতা ও নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারসহ নানা ঘটনার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

দেড় ঘণ্টা বৈঠকের পর ফ্রন্টের নেতাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ড. কামাল হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যরা ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারী, গণদলের সভাপতি গোলাম মাওলা চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন ..